কিছুটা স্মৃতি, কিছুটা পাথর
কিছুটা স্মৃতি ছিল, কিছুটা পাথর
কিছুটা ঝুলছে বাতাসে, কিছুটা কার্নিশে।
যেটুকু লোকে বলে, কিছু কিছু লোক
দলে থেকেও তারা ভিন্ন, আলাদা দলে ভিন্ন তাদের সুখ
মিছিলের উঁচু সুর, নিচু সুর
সামনে অথবা পেছন, একই রকম থাকে না মোটেও
কিছু কিছু বিনাশে, কিছু কিছু বিন্যাস
মত আর মৃত্যুর মুখোমুখি মানুষ।
তাদের কান্না আর আর্তনাদ বাজে না দীর্ঘক্ষণ
বাতাসও তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়
বিলোড়নের সুবিশাল সাগরে
তবুও কি মেনে নিতে হবে ভুলভাল জনতাকে
যারা যতটা এগিয়েছে কৌশলে
যাদের কৌশল মিশেছে জল ও জনতায়
তবু ক্রন্দন শুনতে পাই পাথরে, দেয়ালে, আগুনে
কিছু কিছু লোক যেভাবে পারে প্রতিবাদী হোক
কিছু কিছু পাথর যেভাবে পারুক গড়িয়ে যাক
তারা কিছুটা কুসুম হোক, কিছুটা ইস্পাত
শোক যার মিশে আছে, বুকের রক্ত আর অস্থিতে
সে তো জ্বলবেই জ্বরা আর ক্ষরায়।
তবুও পুড়ছে, কিছুটা স্মৃতি, কিছুটা পাথর।
ভুল
কিছু কিছু ভুল করাটাই ভুল হয়েছে
ভুল হয়েছে ভুলগুলোকে বাড়তে দিয়ে
ভুলগুলো তো চোখের সামনেই
চারা হলো
বৃক্ষ হলো
ডালপালা ছড়িয়ে দিয়ে
ফল দিয়েছে
এখন তারা অন্য ভুলের জন্ম দিচ্ছে।
কিছু কিছু ভুল করাটাই ভুল হয়েছে
ভুল হয়েছে ভুল মানুষের সাথে মিশে
ঘৃণা করি
যা কিছু আজ হয়েছে ভালো, ঐ মানুষের সাথেই মিশে
ভালোবাসি।
কিছু কিছু ভুল করাটাই ভুল হয়েছে
কিছু কিছু ভুল আছে যা
ছোট্ট জীবন নষ্ট হলেও
যায় না ভোলা।
কিছু কিছু ভুল করাটাই ভুল হয়েছে
কিছু কিছু ভুল আছে যা
ছোট্ট হলেও
অনেক জ্বালা
যায় না ভোলা।
এমন অনেক ভুল আছে যা
ভুল করাটাই, মহা ভুলের
জীবন গেলেও যায় না মুছে
কিছু কিছু ভুল করাটাই ভুল হয়েছে।
মানুষ হব
ইচ্ছেগুলো খুবই স্বাধীন
প্রাপ্তিগুলো স্বাধীন নয়।
ইচ্ছেগুলো আমার ছিল
ইচ্ছেগুলো রাজাই নয়।
ইচ্ছে ছিল মানুষ হব
হয়তো আমি মানুষ নই।
মানুষ হলে ইচ্ছে থাকবে
বেঁচে থাকার স্বপ্ন থাকবে
স্বপ্নগুলো অন্যরকম।
মানুষ হলে কালবৈশাখী ঝড় থাকবে
বুকের মাঝে রঙিন কিছু ফুল থাকবে
ভাঙাগড়ার ক্ষোভ থাকবে
অপমানের ক্লেদ থাকবে
উপহাসের রেশ থাকবে
ঝড়-তপ্ত দিন থাকবে
ভালোবাসার বুক থাকবে।
মানুষ হলে শুধরে নেবার পথ থাকবে
উল্লসিত দিন থাকবে
কিছু কিছু উল্লসিত পাথর থাকবে
যখন সময় বুকের মাঝে চাপা দেবে
স্বপ্ন, ধোঁয়া, অশ্ব থাকবে
অবোধ, ভীরু, আর হ্যাঁ করা
ইচ্ছেগুলো, মানুষ হবে।
চোখের অসুখ
ডাক্তার বলেছেন : আলসার, স্ক্রেচ ও রেড আই
মাত্র কয় কিলোদূরে তোমার ঘর
অথচ মন চাইল না, তোমাকে বলি
বা বলবার চেষ্টা করি, কতটা সাহস।
কেউ কেউ বলেছে অন্ধত্ব কাছে
ভেবেছি আর দেখব না আকাশ
আকাশের তারা, রুপালি চাঁদ,
তোমাকে নিয়ে কবিতা।
বার্ধক্য নিয়ে খেলছেন বিধাতা
রোগের বিপরীতে রোগের
দৃশ্যকায় জীবাণু
জলের শরীর।
মন চাইল না, তোমাকে বলি
ভালোবাসা উড়ছে আকাশে
যেখানে উদাসীন
গোপনের বহুদিন
আকাশে বাতাসে কখনো-সখনো
অথচ দেখো, আমার গুরুতর চোখের অসুখ।
মন চাইল না, তোমাকে বলি
শুধু বিনিময়
যতটা বাতাসে ওড়ে
ভয় বা প্রত্যাশা
যতটা তুমিও ভাবো
আমি ততটা দূরের ভাবিনি কখনো।
মন চাইল না, তোমাকে বলি
আর হয়তো দেখব না কোনো জড়তা
তুমি জানতে চাইবে না
কতটা মেঘে বিচ্ছিন্ন রেখেছে পথ
কতটা অজানা
হাত ছুঁয়ে দেখি জল
কতটা শান্ত, কতটা ফেনিল
আমার চোখের অসুখ।
মন চাইল না, তোমাকে বলি
হয়তো জেনেছ
হয়তো দেখব না
মন হয় জটিল মানুষ
বার্ধক্য ছুঁয়েছে মন
এই নয় শেষ
তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম : আমার চোখের অসুখ।
পথের কষ্ট
ঘুমিয়ে থাকে রাস্তা, এগিয়ে দেয় পথ
জানে না সে, কোথায় যেতে হবে তাকে
মানুষেরা তাকে টেনে নিয়ে যায়
গঞ্জ, মাঠ, জলাশয়, মালভূমি, প্রিয়ঘর—
সবখানে। মাঠের মধ্যে পড়ে থাকে রাস্তা নিশ্চুপ
বুকের মাঝেও পড়ে থাকে চুপচাপ।
কোনো কোনো জীবন বিরাগী হলেও চলে যায় পথ দিয়ে
কেউ কেউ জীবন ভালোবেসে চলে যায় পথ দিয়ে
কেউ কেউ চলে জীবনে কোনোদিন ফিরবে না এই স্থির করে
মাতালেরা চলে যায় হল্লা করে করে
কারো কারো গন্তব্য সহজ
কারো কারো গন্তব্য কখনো হয় না শেষ
তারা আজীবন পথেই থেকে যায়
পথ যেমন জানে না কিছু
পথ যেমন শোনে না কিছু
পাথরে আগুন জ্বলে জ্বলেও সৃষ্টি হয় পথ
কষ্টটা পথেরাই জানে।
পুড়ে পুড়ে পথ
উন্নত করে শির
মোহাচ্ছন্ন তাদের নিদ্রাগুলো ফেলে
জানে না কিছু
বোঝাতে পারে না একা একা সবকিছু
মানুষ চলে যায় কোনো না কোনো রাস্তা দিয়ে,
চলে যেতে হয়।
ললাটে জমেছে ঘাম
প্রকারান্তে প্রচণ্ড নিদ্রা কায়ক্লেষে রেখে
প্রকারান্তে প্রচণ্ড তৃষ্ণা চেপে রেখে রেখে
সেখানে চকচক করে মোহনীয় জ্যোৎস্না
আবার কখনো গহিন অন্ধকার
মানুষেরা বোঝে না কষ্ট
অথচ তাদের বুকে দগদগে কষ্টের দাগ
ওপরে পোড়া আকাশ
তবুও বাকরুদ্ধ বয়ে নিতে হবে মানুষ, পশু আর সম্মিলিত নিষ্ঠুরতা
পথের মধ্যেই ছিল কষ্ট, পথেরা জানত।
শুধু জানত না মানুষ আর মানুষের পশু।
প্রভেদ মানুষের
প্রভেদ মানুষের!
হতেই পারে, হতে পারে ভেদাভেদ
এইটুকু দিয়ে হয় না ফলাফল বিচার
জটিল বহুরূপী, এইসব ঝিলিমিলি ছল
বাড়ায় দূরত্ব, ভেতর ও বাহির
বাড়ায় ভেদাভেদ
কেন হলো প্রভেদ? রাখে না কেবল মনে
বুঝেও না
বুঝলেই হয়ে যেত ঝিলিমিল।
প্রভেদ হলেই শুরু হয় ভুল
ভুলের ভেতর ভেঙে ভেঙে ভুল
অভিমানি ভুল
ভুলের হিংস্রতা
ভাঙে জন, ভাঙে মন, ভাঙে মনের নিবিড়তা
এইভাবে, ভুল আর হিংস্রতা মিশে হয় স্ফুলিঙ্গ
মুহূর্তেই পোড়ে মন, মান, সকল সম্পর্ক
জ্বলে পুড়ে ছাই।
তাতেই শেষ নয়
আগুন ছড়ায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে
মানুষের প্রভেদ।
এ শহর গল্পের শহর
এ শহরে কত গল্পের জন্ম হয় প্রতিদিন
কত গল্প অকালে হারায়
কত গল্প ভেসে ভেসে উড়িয়ে দেয় সকল রূপকথা।
আমরা এ শহরে আছি।
কিন্তু থাকব না
এ শহরে আর থাকব না। থাকা যায় না
এ শহর আমাদেরকে থাকতে দেবে না
এ শহরে থাকার কোনো পরিবেশ প্রতিবেশ নেই।
এ শহরের জীবন নেই।
কেউবা আমরা পারিবারিক যুদ্ধে বন্দি
সেই ব্যূহ ভেঙে বেরোতে পারি না।
কেউবা আবার আভিজাত্যের
চরম হিংসে থেকে বেরোতে পারছি না।
কেউবা আবার হাসিমুখে অনটন সাজায়
অনটন কাউকে কাউকে উল্টোভাবে হিংস্র করে দেয়।
কেউবা ওড়াচ্ছে টাকার বদলে ডলার
কেউবা ডলারের গন্ধে উইপোকা
কেউবা ডলারের লোভে চাটুকার
কেউবা বেড়ায় প্রতিদিন কফিশপ, চাইনিজ, পশ ভোজনালয়
কেউবা ডাস্টবিনে খোঁজে ক্ষুধার খাবার
ঘুমায় ফুটপাতের মানুষ চলাচলের পটভূমিকতায়
কেউবা অর্থাভাবে সারাদিন ভবঘুরে।
কোনো কোনো গল্পে অ্যাবর্শন ভালো নিন্দার চেয়ে
কোনো কোনো গল্পে মৃত্যুই একমাত্র পথ অবহেলার চেয়ে
কোনো কোনো গল্পে আপনজনরাই প্রধানতম শত্রু,
গল্পের হুমকিদাতা।
কোনো কোনো মা-বাবা অবহেলিত হয়ে হয়ে উচ্ছিষ্ট হয়ে যায়।
কোথাও কোথাও গল্প হয় বৃষ্টি
কোথাও কোথাও ঘাস
কোথাও কোথাও আকাশের ঘুড়ি
কোথাও কোথাও পাগলের প্রলাপ
কিছু গল্প চলছেই, চলবেই
কিছু কিছু গল্পের উপাদান লাগে না
কিছু কিছু গল্প নিজেরাই উন্মাদ
কিছু কিছু গল্প নির্জনতায় ঘুরে আসে নিঝুম শহর
এটা গল্পের শহর।
কোথাও কোথাও দখল হয় বাড়ি-ঘর, জমি-জমা, অফিস-আদালত
রাজনৈতিক শক্তির কাছে সকলে অসহায়
তারা চেনে না, বোঝেও না, আপনজন, আত্মীয় কর্মী, দলীয় কর্মী আর শ্রমিকের দল
এ শহরে কারো টাকা রাখবার জায়গা নেই
আবার কেউ একমুঠো খাবারের জন্য প্রতিদিন অসহায়।
পুস্তক চাই, খাবার চাই, পড়াশোনা চাই, চিকিৎসা চাই
সকল জায়গায় এই ব্যবস্থাগুলো করুন।
এ আমাদের গল্পের শহর
এ রকম আমাদের গল্পগুলো
এখানে প্রতিনিয়ত গল্প সৃষ্টি হয়।
আমরা এসব থেকে বেরোতে চাই
এত ভেদাভেদ রেখে
এত হিংসেগুলো রেখে
এত লোভের পসরা সাজিয়ে হারে বা হারায় প্রতিনিয়ত
এ শহরে মৃত্যু খবর হয়, আবার খবরের মৃত্যু হয়
এ শহরে মৃত ব্যক্তি হেঁটে বেড়ায়, আবার জীবিতের মৃত্যু হয়ে যায়
এ শহর গল্পের বা স্বপ্নের
এ শহর স্মৃতির
এ শহর আমাদের
এমনটা আমরা ভেবেছি
এমনটা আমাদেরকে ভাবতে হয়েছে।
গল্পের এই শহরে গল্পের শেষ নেই
তাদের সমাধান নেই
তাদের অবদান নেই
দৈনন্দিন গল্প হয়
আর আমরা বিষ ছড়িয়ে দিই সর্বত্র।
দৈনন্দিন গল্প
রোজ ঘুমাতে হয়। ঘুম থেকে ওঠাতে আর পাখিরা ডাকে না।
ডেকে দেয় মোবাইলের অ্যালার্ম
দায়িত্ব নিয়েছে পাখির বদলে যন্ত্র
ছোট্ট জীবন নাচতে ভুলে গেছে
সে দৌড়াবে যন্ত্র হয়ে যন্ত্রের তালে তালে।
অনেক স্বপ্ন সাধ জন্ম নিয়েছিল
অনেক পরিকল্পনা বাসা বেঁধেছিল বুকে
চোখগুলো রাজপথ হয়ে মেলে দিয়েছিল ডানা
তারা অজানা গ্রহে গিয়ে মিশেছিল
ইচ্ছেগুলো চিলের মতো ছোঁ মেরে নেয় কালো রঙের কাক
তাদের ক্ষুধার কাছে স্বপ্নগুলো শুকনো এক একটি রুটি।
পথ থেকে পথে ধূলি হয়ে ঘুরে বেড়াব শুকতলি ক্ষয়ে
কোনো না কোনো উদ্দেশ্যে আমরা গন্তব্যের দিকে ছুটে বেড়াব
রোজ রোজ পা পথ আর অচেনার মিছিল হয়
রোজ রোজ নীরব মিছিলে আমরা গন্তব্য ছুঁয়ে বেড়াই
আমাদের পায়ের নিচে ভাঙা রাস্তা, চোখের সামনে ক্রমাগত বাঁধা
কোন পথে আমরা স্বপ্ন ছোঁব
কোন পথে বাড়িয়ে দেব আমাদের স্বপ্নের হাত স্বপ্ন আর সাধনায়।
প্রত্যহ আমাদের কর্মের মিছিল
মৌলিক চাহিদার দুরন্ত প্রত্যাশায়
তাতে আমাদের ঐক্য ঐক্যদাতার সাথে
আমাদের ঐক্য অসহনীয় সময়ের সাথে
আমাদের ঐক্য অসহিষ্ণু পরিবেশের সাথে
আমাদের ঐক্য পারস্পরিক ভঙ্গুর সম্পর্কের সাথে
তবুও হাসবার শক্তি অর্জন করতে হয়
তবুও সন্ধি করতে হয় কচিকাঁচাদের মুখে জীবনের জন্য।
আমরা কতবার এলোমেলো হয়ে যাই
কতবার দৈনন্দিনতাকে নিছক পাউরুটি ভেবে
ঝুলিয়ে দিতে চাই কৃশকায় হৃদয় অনায়াসে
কত কিছু ঘটে যায় পাখিদের ডানার ঝাপটায়
পাখিরা আকাশে মেলালেও
আমরা ডানার ঝাপটায় মুখ থুবরে পড়ে থাকি
স্বরলিপি লেখার বদলে আমরা শৃঙ্খলিত হই
নীতির ঢেউয়ে আইনের সাপগুলো ডানার ওপর সক্রিয় হয়।
কারখানায়, চিমনিতে, খনিতে কত মানুষ অকালে হারায়
কতজন ফুটপাতবিহীন ব্যস্ত রাস্তায়
কতজন বখে যাওয়া ছেলেদের ভুল নেশায়
কতজন ইত্যকার নিত্য রুটিনে
কতজন অতিচাপে হৃৎপিণ্ড হারিয়ে
হিসেব নেই অনেক বড় হিসেবের।
কত কিছু হয়ে যায় ভুল
কত কিছু ভুলেই নিমজ্জিত
মোহের পেছনে ছুটবার ভুল
খুব কম নয়
দৈনন্দিন গল্পেই থাকে আমাদের যাপিত জীবন
জীবনের ধোঁয়াশা।