ছোটবেলা থেকে ঈদ মানেই ছিল কিশোর আলোর ঈদসংখ্যা। আমার বই পড়ার হাতেখড়ি মূলত কিশোর আলো দিয়ে। কারণ আমার আশে পাশে শুধু আমিই একমাত্র বই পড়তাম। আর তখন বই যে কিনবো সে টাকা পাবো কই! কোনোমতে ৫০ টাকা জমিয়ে প্রতি মাসে কিশোর আলো কিনতামই- কিনতাম।
তখন কিআ’র মাধ্যমেই আস্তে আস্তে পরিচিত হচ্ছিলাম ছোটগল্প, উপন্যাস আর আমার সবচেয়ে পছন্দের থ্রিলার জনরার সাথে। তবে কিআ’র ঈদ সংখ্যাগুলো অন্যসব সংখ্যাগুলোর থেকে বরাবরই আলাদা থাকতো। সারাটা বছর অপেক্ষা করতাম এই ঈদ সংখ্যার জন্য। কিআ’র ঈদ সংখ্যাগুলো এতো সুন্দর হতো, মন ভোলানো ছিল সংখ্যাগুলো।
কতো রকমের যে ছোটগল্প, রহস্যে গল্প, কমিক্স । বেশি বেশি কমিক্স আর গল্পে ঠাসা থাকতো। ঈদ স্পেশাল অনেক কিছুও বের হতো। এখনো মনে আছে ঈদে দাদুর বাড়ি যাওয়ার সময় জামাকাপড়ের সবচেয়ে উপরের রাখতাম রঙিন ঝলমলে ঈদ সংখ্যাটাকে। ঈদের আনন্দ তখন শুধু নতুন জামা নয়, একটা নতুন গল্পের জগতও ছিল। আমি কেন জানি না একদম দাদুর বাড়িতে উপস্থিত হয়েই কিআ নিয়ে বসতাম, এর আগে খুলেও দেখতাম না কি কি আছে।
কি যে মজা করে দাদুর গাছতলায় বসে বসে পড়তাম! এক আলাদা জগতে থাকতাম তখন। আর তখন দাদুর বাড়িতে বিদ্যুৎ এর প্রচলনও হয়নি, কিশোরআলো পড়া ছাড়া আর করতামইবা কি?
সময়ের সাথে সাথে এখন আর রেগুলার কিআ পড়া তো দূর কেনাও হয় না, তবে চেষ্টা করি প্রতিবছর ঈদ সংখ্যাটা অন্তত কেনার। এখন ইদে আলাদা করে বইয়ের জন্য বাজেট থাকে, আগের থেকেই চিন্তা করা থাকে ঈদ সালামি দিয়ে কি কি বই কিনবো। যেমন এবার ঈদে ঠিক করেছি সালামির টাকা যা ই পাবো তা দিয়ে শুধু হুমায়ূন আহমেদের বই কিনবো। কারণ আমার এবারের নিউ ইয়ার রেজুলেশন ছিল হুমায়ূন আহমেদের সব বই আমার কালেকশনে রাখা। অনেক বই আছে আমার কালেকশনে তবে সব রাখতে চাচ্ছি। আমার প্রত্যেক ঈদ মোটামুটি একই রকম কাটে। দাদা-দাদু আছেন দেখে প্রত্যেক ঈদ গ্রামেই কাটে। আর সাথে কিছু নেই- তবে বই তো যাবেই আমার সাথে। নতুন জামাকাপড় পরে, সেমাই চিনি খেয়ে বই পড়তে বসি। দাদুর বাড়ির ছোট গাছতলাটা এখন আর নেই, সেই টিনের চালের বদলে এখন আমার বেশি সময় কাটে মার্বেলের ছাদে। আমড়া গাছের ছায়ায় বই পড়ার যে কি এক আনন্দ।
তবে আমার কাছে এখনও ঈদ মানে ঝলমলে প্রচ্ছদের ঈদসংখ্যা। খুব কষ্ট করে জমানো ৫০ টাকা দিয়ে একটা কিআ কেনা। নতুন জামার সাথে সাথে এবার কি নতুন গল্প এলো তা নিয়েও অনেক এক্সসাইটেড থাকা।
ছোট্ট মাহীর পছন্দের ঈদ স্মৃতি এখনও আব্বুর কাছ থেকে সালামি নিয়ে পরের মাসের কিশোর আলো কেনা। কি সহজ-সরল ঈদের দিনগুলো আমরা ফেলে আসলাম। তখন কি জানতাম যে একটা কিশোর আলো কিনতে কতদিন টিফিনের টাকা জমাতে হতো সেই একই কিশোর আলো এখন একসাথে ১০টা কিনতে পারবো কিন্তু সেই একই আনন্দ এখন আর পাবো না। ঈদ কার্ড, রঙিন স্টিকার আর নতুন জামা কাউকে না দেখানোর মতো আনন্দের সাথে সাথে হারিয়ে গেলো আমার সেই আগলে রাখা ঈদসংখ্যা গুলোও। ছোটবেলার সেই নির্ভেজাল খুশি আর সহজ সরল দিনগুলোই হয়তো সবচেয়ে দামি ছিল।