হারুকি মুরাকামি
ভাষান্তর : সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি


রোজকার মতন সেই শুক্রবারেও ওয়েটারের দায়িত্ব পালন করছিলো মেয়েটা। তার বিশ বছর বয়স হয়েছিলো সেদিন, মানে যাকে বলে বিশতম জন্মদিন। জন্মদিনের দিন কে শেফের গালিগালাজ খেতে খেতে কাস্টোমারদের টেবিলে পাম্পকিন নোচ্চি আর সীফুড পরিবেশন করতে চায়? কেউ না। মেয়েটাও চায়নি। বন্দোবস্ত আগেই করা ছিলো। কথা ছিলো রেস্তোরার আরেকটা পার্ট-টাইম ওয়েটার যে মেয়েটা, শুক্রবার রাতে সে কাজ করবে। আর আমাদের বার্থডে গার্ল? নিজের জন্মদিনটা নিজের মতন করে কাটাবে সে। কিন্তু শেষবেলায় এসে বাজেরকমের ঠান্ডা, ডায়রিয়া আর ১০৪ ডিগ্রি জ্বর বাঁধিয়ে বসলো অন্য পার্ট-টাইম মেয়েটা। না চাইতেও হুট করে জন্মদিনের দিন কাজে আসতে হলো ওকে।

অসুস্থ ওয়েটার অবশ্য ফোন করেছিলো মাফ চাইতে। বেচারি আসলেও এমন ঝামেলায় ফেলতে চায়নি। কিন্তু কী আর করা!
“ব্যাপার না! বিশতম জন্মদিন তো কী হয়েছে? জন্মদিনে আমার এমনিতেও তেমন কোনো প্ল্যান থাকে না!” অসুস্থ মেয়েটাকে ফোনের এপাশ থেকেই বোঝানোর চেষ্টা করলো মেয়েটা।

আসলেও যে খুব একটা খারাপ লেগেছে ছুটি না পাওায় এমন না। এমনিতে জন্মদিনটা নিজের প্রেমিকের সাথে কাটায় মেয়েটা। সেই হাই-স্কুল থেকে প্রেম তাদের। কিন্তু এবার কেমন একটা বাজে ঘটনা হয়ে গেলো। জন্মদিনের কয়েকদিন আগেই ছোট্ট একটা ব্যাপার নিয়ে প্রচন্ড চিৎকার-চেঁচামেচি বেঁধে গেলো দুজনের। এমন তিক্ততা নিয়ে থাকা যায় না। একেকবার তো মেয়েটার মনে হলো, এবারই শেষ। সম্পর্কটা ফুরিয়ে এসেছে। ভেতরে ভালোবাসার যে মিষ্টি অনুভূতিতা, সেটা কেমন যেনো শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে। মরে গেছে। সেই শেষ। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি দুজনের। মেয়েটাও কল দেয়নি। নিকট ভবিষ্যতে কল করবে সেই সম্ভাবনাও নেই।

টোকিওর টনি রোপোংগি ডিস্ট্রিক্টের একটা ইতালিয়ান রেস্তোরাঁয় কাজ করে মেয়েটা। সেই ষাটের দশক থেকে চলছে এই রেস্তোরাঁ। আধুনিক খাবার খুব একটা না থাকলেও এই অঞ্চলে রেস্তোরাঁটা বেশ বিখ্যাত। খাবার যেমন স্বাদের, ভেতরটাও ঠিক তেমন নিরিবিলি, শান্ত। পরিবেশ আর খাবারের দিক দিয়ে দেখলে আরো অনেকের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে এই রেস্তোরাঁ। কমবয়েসী লোকজন কদাচিৎ আসে এখানে। আসে সব বয়স্ক গ্রাহক, বিশেষ করে বিখ্যাত সব পারফর্মার আর লেখক। আর যারা একবার আসে, বারবার আসতে থাকে।

সপ্তাহের ছয়দিনে মোট দুইজন ফুল-টাইম ওয়েটার কাজ করে রেস্তোরাঁয়। সাথে ওরা দুইজন পার্ট-টাইম ওয়েটার। পালা করে তিনদিন আসে ওরা। এই চারজন বাদেও রেস্তোরাঁয় আছে একজন ফ্লোর ম্যানেজার, আর রেজিস্টারে সারাদিন ঠাই বসে থাকা হাড় জিরজিরে এক মহিলা। মাঝবয়েসী মহিলাটা রেস্তোরাঁর শুরু থেকেই আছে। হুট করে দেখলে লিটল ডোরিট থেকে উঠে আসা কোনো কাল্পনিক চরিত্র বলে ভুল হয়। সবসময় কালো পোশাক পরে এই মহিলা। তার মূলত দুটো কাজ- এক, খাবারের টাকা নেওয়া, আর দুই, ফোনে কথা বলা। এছাড়া খুব কম কথা বলে সে। কেমন যেনো একটা শীতল আর কঠিন ব্যাপার আছে মহিলার মধ্যে। রাতের বেলা মহিলাকে সমুদ্রে পানিতে ভাসিয়ে দিলে ওর ধাক্কায় দুই-একটা জাহাজ নির্ঘাত ডুবে যাবে।

ফ্লোর ম্যানেজারটা বেশ লম্বা-চওড়া। দেখলেই বোঝা যায় একটা সময় খেলাধুলায় মন ছিলো। কিন্তু সে অনেককাল আগের কথা। এখন চোয়াল আর পেটে বেশ খানিকটা আলগা মাংস লেগেছে। মাথায় ছোট করে ছাটা চুলগুলো পাতলা হয়ে উঠেছে ক্রমশ। চারপাশে একমন একটা বয়স্ক-ব্যাচেলর ঘ্রাণ ভাসে লোকটার, অনেকটা খবরের কাগজকে কফ সিরাপের সাথে দীর্ঘসময় ড্রয়ারে আটকে রাখলে যেই গন্ধ আসে, তেমন। ঠিক এই ঘ্রাণটা মেয়েটা আগেও পেয়েছে, নিজের এক আইবুড়ো চাচার কাছ থেকে। এমন ঘ্রাণ কি সব আইবুড়ো লোকের থেকেই আসে নাকি?

কালো স্যুট, সারা শার্ট আর একটা বো-টাই পরে থাকে লোকটা সবসময়। লোক দেখানো বো-টাই না, আসল বো-টাই। আয়নার দিকে না তাকিয়ে বো-টাই বাঁধতে পারায় লোকটার মধ্যে কেমন একটা গর্ব আছে। রেস্তোরাঁর ফ্লোর ম্যানেজার হিসেবে তার কাজ ম্যালা। কাস্টোমারের আসাযাওয়া খেয়াল রাখা, কবে কত লোকের বুকিং আছে সেটা মনে রাখা, নিয়মিত গ্রাহকদের চেনা, তারা আসলে হাসিমুখে অভিবাদন জানানো, কারো কোনো অভিযোগ থাকলে মন দিয়ে শোনা, কোন ওয়াইনটা ভালো সেটা নিয়ে গ্রাহকদের পরামর্শ দেওয়া, রেস্তোরাঁর ওয়েটারদের দিকে নজর রাখা- আরো কত কী! দিনের পর দিন এই একই কাজ সুনিপুণভাবে করে আসছে লোকটা। শুধু তাই না, প্রতিদিন রেস্তোরাঁর মালিকের খাছে রাতের খাবার পৌঁছে দেওয়াটাও তার কাজের একটা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

“রেস্তোরাঁর মালিক রেস্তোরাঁর বিল্ডিং-এরই ছয়তলায় থাকতো,” বললো মেয়েটা। “বাসা, অফিস বা অন্য কিছু একটা হবে”

কীভাবে কীভাবে যেনো মেয়েটা আর আমি নিজেদের বিশতম জন্মদিন নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিলাম। বিশ বছরে পা দেওয়ার ব্যাপারটা সবারই মনে থাকার কথা। সেখানব থেকেই এই আলোচনার শুরু। অবশ্য মেয়েটার জীবনের সেই জন্মদিন আরো দশ বছর আগে এসেছিলো।

“রেস্তোরাঁর কেউ অবশ্য মালিকের চেহারা জীবনেও দেখেনি। শুধু ফ্লোর ম্যানেজারই ডিনারের সময় লোকটাকে দেখার সুযোগ পেতো। আমরা বাকিরা জানতামও না লোকটা দেখতে কেমন।”
“তারমানে রেস্তোরাঁর মালিক তার রেস্তোরাঁ থেকেই খাবার ডেলিভারি করতো।”
“হ্যাঁ, প্রত্যেকদিন রাত আটটার সময়। রেস্তোরাঁর সবচেয়ে ব্যস্ত সময় ছিলো ওটা। ওইসময় ম্যানেজার না থাকায় ভালো ঝামেলায় পড়তাম আমরা বাকিরা। কিন্তু আর কোনো উপায়ও ছিলো না। বছরের পর বছর ধরে চলে আসছিলো এই নিয়ম। ওই যে হতেলে রুম সার্ভিসের জন্য যে ট্রলি ব্যবহার করে, ওইগুলোর একটায় খাবার ভরে নিয়ে যেতো ফ্লোর ম্যানেজার এলিভেটরে।যাওয়ার আগে একদম টিপটপ হয়ে থাকতো। ঠিক পনেরো মিনিট বাদে খালি হাতে ফিরে আসত সে। ঘন্টাখানিক বাদে আবার উপরে গিয়ে খালি থালা আর গ্লাস নিয়ে আসতো। অনেকটা ঘুরতে থাকা একটা একঘেয়ে ঘড়ির কাঁটার মতন। প্রথম প্রথম আমার নিজেরই খটকা লেগেছিলো। কিন্তু পরে অভ্যাস হয়ে গেছে। ব্যাপারতা নিয়ে চিন্তা করাও বাদ দিয়েছিলাম একটা সময়।”

রেস্তোরাঁর মালিক সবসময় মুরগী খেতেন। মুরগীর রেসিপি আর সাথে থাকা সব্জিতে বদল আসতো, কিন্তু দিনশেষে সেই মুরগীই। এক তরুণ শেফ একবার টানা এক সপ্তাহ একই মুরগীর রান্না পাঠিয়ে দেখেছিলো। কোনো লাভ হয়নি। না কোনো অভিযোগ, না কিছু। এ যেনো একটা অন্ধকার গুহায় পাথরের টুকরো ছুড়ে মারার মতন ব্যাপার। নানান শেফ নানান জিনিস চেষ্টা করেছে। ভালো রান্না, নানান রকম আলাদা আলাদা রেসিপি, মুরগী বদল- কোনোকিছুতেই কোনো প্রশংসা বা মন্তব্য আসেনি উপর থেকে। দিনশেষে মুরগীটাকে ভালোভাবে রান্না করে পাঠানোর দায়িত্বটাকেই মেনে নিয়েছে শেফরা।

আর সব দিনের মতনই সেই ১৭ নভেম্বর, জন্মদিনের দিনটায় কাজ শুরু হয়েছিলো। সেদিন বিকেল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছিলো। সন্ধ্যার শুরুর দিকে ঝমঝমিয়ে নামতে শুরু করলো ফোঁটাগুলো। পাঁচটার দিকে রেস্তোরাঁর সবাইকে দাঁড় করিয়ে কী কী স্পেশাল রান্না হবে বুঝিয়ে দিচ্ছিলো ম্যানেজার। তার বলা সবগুলো কথা মুখস্ত করতে হবে, লেখা যাবে নাঃ ভীল মিলানিজ, সার্ডিন আর বাঁধাকপি দেওয়া পাস্তা, চেস্টনাট ম্যুজ। মাঝেমধ্যে কাস্টোমার হয়ে খোদ ম্যানেজার নানান প্রশ্ন ছুড়ে দিতো এই সময়। রেস্তোরাঁর খাবারের পালা শেষ হলে শুরু হতো কর্মীদের খাবার নিয়ে কথা। খালি পেটে কর্মীরা কাস্টোমারদের খাবার দেবে তা হতে পারে না!

রেস্তোরাঁ চালু হলো ছয়টায়। কিন্তু বাইরে যা বৃষ্টি! জন্মদিনের সেই দিনটায় তাই লোক এলো খুব কম। কয়েকটা রিজার্ভেশন বাতিল হয়ে গেলো। কার এতো ঠ্যাকা পড়েছে এই বাদলার দিনে বাইরে বেরিয়ে পোশাক নষ্ট করতে? পুরোটা সময় ম্যানেজার সেদিন চুপচাপ ঘুরে বেড়ালো। কর্মোরা কিছুক্ষণ লবন আর গোলমরিচের শেকার্সগুলো সাজালো, কিছুক্ষণ শেফের সাথে গল্পগুজব করলো- এইটুকুই! রেস্তোরাঁর চারপাশে তাকালো মেয়েটা। পুরো জায়গায় মাত্র একটা কাপল বসা। ছাদের স্পিকার থেকে মৃদু সুর ভেসে আসছে। বাতাসে শেষ-বসন্তের সুবাস মেশা।

ঠিক সাড়ে সাতটার দিকে ম্যানেজারের শরীর খারাপ করলো। একটা চেয়ারে পেট চেপে বসে পড়লো সে। চেহারা দেখে মনে হলো পেটব্যথা না, কেউ ওর পেটে গুলি করেছে। কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। “হাসপাতালে যাওয়া দরকার!” বিড়বিড় করলো ম্যানেজার। এমনিতে প্রায় কখনোই অসুস্থ হয় না লোকটা। দশ বছর হলো সে এই রেস্তোরাঁয় কাজ করছে। কখনোই অসুস্থ হয়ে ছুটি নিতে দেখেনি তাকে কেউ এতোগুলো বছরে। ব্যাপারটা নিয়ে মনে মনে চাপা একটা গর্বও আছে লোকটার। কিন্তু আজ মনে হলো কাজ কামাই না দিলেই হচ্ছে না!

অগত্যা একটা ছাতা মাথায় দিয়ে ক্যাব খুঁজতে বেরোলো মেয়েটা। একজন ওয়েটার ম্যানেজারকে ধরে ধীরে ধীরে গাড়ির মধ্যে নিয়ে গেলো। হাসপাতাল অব্দি ম্যানেজারের সাথে যাবে সে। গাড়ি চলার ঠিক আগ দিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালো ম্যানেজার, “ঠিক আটটায় রুম ৬০৪-এ খাবার নিয়ে যাবে। কিচ্ছু করা লাগবে না। স্রেফ বেল বাজাবে আর “আপনার ডিনার রেখে যাচ্ছি” বলে খাবারটা সেখানে রেখে চলে আসবে।”

“রুম ৬০৪?”
“ঠিক রাত ৮টায়, মনে থাকে যেনো।” ব্যথায় কোঁকাতে কোঁকাতে বললো ম্যানেজার। খানিক বাদেই দূরে চলে গেলো গাড়িটা। বৃষ্টি থামার কোনো নাম নিলো না ম্যানেজার যাওয়ার পরেও। কিছু কাস্টোমার এলো, তাও অনেক পরে। একসাথে খুব বেশি হলেও একটা বা দুইটা টেবিল ভরলো কেবল। যাক বাবা, ম্যানেজার অসুস্থ হওয়ার একটা ভালো দিন বেছেছে। নাহলে লোকজন নেই, ম্যানেজার নেই- সামলানোটা কষ্ট হয়ে যেতো। মাঝেমধ্যে তো সবগুলো ওয়েটার আর ম্যানেজার মিলেও সার্ভ করতে ঝামেলা হয়ে যায়। আজ সেই চিন্তা নেই দেখে খান্নিকতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো মেয়েটা।

আটটা বাজতেই রুম সার্ভিসের কার্টটা নিয়ে এলিভেটর করে ছয়তলায় চলে গেলো মেয়েটা। খাবার বেশ পরিপাটি। ছিপি ঢিলে করা বোতলে আধ বোতল রেড ওয়াইন, থার্মাল পট ভরা কফি, সেদ্ধ সব্জির সাথে চিকেন অন্ট্রে, ডিনার রোল আর একটু মাখন। ছোট্ট এলিভেটরটা খাবারের গন্ধে ভরে গেলো। এলিভেটরের মেঝেতে ছোট ছোট পানির ফোঁটা। একটু আগেই ছাতা মাথায় কেউ এখানে দাড়িয়েছিলো।

কার্টটা ঠেলতে ঠেলতে ৬০৪ নং রুমের সামনে চলে এলো মেয়েটা। ৬০৪। এটাই তো ঘরটা? মনে মনে আরেকবার বাজিয়ে নিলো সে। হ্যাঁ, এটাই। দরজার পাশেই থাকা বোতামটায় চাপ দিলো মেয়েটা। বিশ সেকেন্ড অপেক্ষা করে আরেকবার ঘন্টি বাজাবে ভাবছে, এমন সময় দরজা খুলে একটা শীর্ণ বৃদ্ধ উদয় হলো। মেয়েটার চেয়েও চার-পান ইঞ্চি ছোট হবে লম্বায়। পরনে কালচে দ্যুট আর নেকটাই। পরনের সাদা শার্টতার উপর হলদেটে নিষ্প্রাণ টাইওটাকে দেখতে মনে হচ্ছে ঝড়ে যাওয়া কোনো গাছের পাতা। বৃদ্ধকে দেখলেই মনে হয় পরিপাটি। জামার কোথাও কোনো ভাঁজ নেই, মাথার সাদা চুলগুলো সপাট; দেখে মনে হচ্ছে এখুনি বাইরে যাচ্ছিলেন। ভ্রুর চারপাশের ভাঁজ উপর থেকে তোলা কোনো গিরিগাথের ছবির মতন দেখতে।

“আপনার রাতের খাবার স্যার,” হালকা ফ্যাসফেসে কন্ঠে বললো মেয়েটা। একটু কাশলো গলা পরিষ্কার করতে। চিন্তিত থাকলে গলা সবসময় এমন ফ্যাসফেসে হয়ে যায় তার।

“রাতের খাবার?”
“হ্যাঁ স্যার। ম্যানেজার হুট করে অসুস্থ হয়ে গিয়েছেন। তাই আমি খাবার নিয়ে এলাম। আপনার খাবার স্যার।”
“আচ্ছা আচ্ছা!” এমনভাবে বললো বৃদ্ধ যেনো নিজের সাথেই কথা বলছে। দরজার নব থেকে হাত নামলো না তার।

“বেশি অসুস্থ?”
“হুট করে পেটে প্রচন্ড ব্যথা। হাসপাতালে গিয়েছেন। মনে হচ্ছে অ্যাপেন্ডিসাইটিস।”
“ওহ হো! তাহলে তো অবস্থা ভালো না!” কপালের ভাঁজগুলোতে হাত বোলাতে বোলাতে বললো বুড়ো।
কেশে আবার গলা পরিষ্কার করলো মেয়েটা। “খাবারটা কি স্যার তাহলে ঘরে দিয়ে যাবো?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। “বললো বৃদ্ধ। “তোমার ইচ্ছে হলে রেখে যাও। আমার কোনো সমস্যা নেই।”
“ইচ্ছে হলে? ভাবলো মেয়েটা। কেমন অদ্ভূত কথাবার্তা। খাবার রাখবো কিনা সেটা আমার ইচ্ছে কেনো হবে?
দরজা পুরোটা খুলে দিলো বৃদ্ধ। কার্ট নিয়ে ভেতরে গেলো মেয়েটা। পুরো মেঝেতে ধূসর রঙয়ের কার্পেট পাতা, কোথাও কোনো জুতো নেই। জায়গাটা ঘরের চেয়ে বেশি কাজের জায়গা লাগে দেখতে। প্রথম কামরাটায় একটা বিশাল স্টাডি। জানলায় চোখ রাখলে দূরে আলোয় আলোকিত টোকিও টাওয়ারের শরীর দেখা যায়। জানালার পাশে একটা বিশাল ডেস্ক, পাশে একটা সোফা রাখা। সোফার পাশের কফি টেবিলটা হাত উঁচিয়ে দেখিয়ে দিলো বৃদ্ধ। টেবিলে ধীরে ধীরে খাওয়ার জন্য সাজালো মেয়েটা। উপরে একে একে ন্যাপকিন আর চামচ, কফিপট আর কাপ, ওয়াইন আর ওয়াইনের গ্লয়াস, রুটি আর মাখর, আর সবশেষে প্লেটভর্তি মুরগী আর সব্জি রাখলো সে।

“দয়া করে জিনিসগুলো প্রতিদিনের মতন হলে রেখে দিলে আমি এক ঘন্টা পর নিয়ে যাবো স্যার,” বললো মেয়েটা। মনে হলো কথা না, একটা প্রচন্ড ঝাকি ব্রিদ্ধকে খাবারের মোহ থেকে বের করে আনলো। “হ্যাঁ হ্যাঁ, রেখে দেবো। সবগুলো হলে রেখে দেবো। কার্টের উপর। এক ঘন্টার মধ্যে। আপনার ইচ্ছেমতন।”

মনে মনে ভাবলো মেয়েটা, হ্যাঁ। এই মুহূর্তে ঠিক এই জিনিসটাই চায় সে। ” স্যার আর কিছু করতে হবে আমাকে?”
“না, আর কিছু করার নেই,” কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলো লোকটা। চকচকে কালো করে পলিশ করা জুতো লোকটার পায়ে। আকারে ছোট আর দেখার মতন। বৃদ্ধ স্টাইল মেনে চলে, ভাবলো সে। বয়সটাও বেশ ভালোই মানিয়ে নিয়েছে।
“তাহলে স্যার আমি কাজে ফিরলাম।”
“সমস্যা না থাকলে আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিতে পারবেন মিস? কিছু কথা বলার ছিলো।”
লজ্জায় গাল লাল হলো মেয়েটার বৃদ্ধের এমনভাবে চাওয়া দেখে। “নিশ্চয়ই স্যার…আমার কেনো সমস্যা থাকবে। পাঁচ মিনিট হলে অবশ্যই দিতে পারবো।” মনে মনে ভাবলো মেয়েটা, তার মালিক তার কাছে পাঁচ মিনিট কেনো, বাকিটা সময়ও পায়। আর যাই হোক, তাকে বেতন দিচ্ছে এই বৃদ্ধ। আর এমনিতেও এই বৃদ্ধকে দেখে মনে হচ্ছে না কোনো ঝামেলার লোক।

নিজের বুকে হাত বেঁধে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো বৃদ্ধ, “তা আপনার বয়স কত?” টেবিলের পাশ থেকে সোজা মেয়েটার চোখ বরাবর তাকালো বৃদ্ধ।
“এখন বিশ।”
“এখন বিশ।” চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আবার বললো বৃদ্ধ, “এখন বিশ। এখন বিশ মানে কখন?”
“মানে আজকেই বিশ হলো,” কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বললো মেয়েটা। “আজ আমার জন্মদিন স্যার।”
“আচ্ছা,” বলে নিচের চোয়াল ঘষতে লাগলো বৃদ্ধ যেনো আজ জন্মদিন হওয়া বিশাল কোনো ব্যাপার।
“আজকেই? আজকেই তোমার বিশতম জন্মদিন?”

মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো মেয়েটা।

“বিশ বছর আগে আজকের দিকে পৃথিবীতে তোমার যাত্রা শুরু হয়েছিলো।”
“জ্বি স্যার, আসলেই।” বললো মেয়েটা।
“আচ্ছা আচ্ছা! খুব ভালো খবর। শুভ জন্মদিন!”
“অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার,” বলতে গিয়েই মনে পড়লো মেয়েটার, আজ সারাদিনে এই প্রথম কেউ তাকে জন্মদিনের শুভকামনা জানালো। অবশি ওইটা থেকে বাবা-মা জন্মদিনের বার্তা পাঠালেও পাঠাতে পারে। সেটাও বাড়ি গেলেই শুনতে পাবে সে, অ্যান্সারিং মেশিনে রেকর্ডেড অবস্থায়।
“তাহলে তো এই উপলক্ষ্যে একটু টোস্ট করাই যায়, নাকি? এই রেড ওয়াইন পান করতে পারি আমরা।”
“ধন্যবাদ স্যার, কিন্তু আমার পক্ষে এখন পান করা সম্ভব না। ডিউটিতে আছি আমি।”
“আরে কে কিছু বলতে যাবে তোমাকে? একটুখানি টোস্টই তো। আমি বলে দিলে কেউ কিচ্ছু বলবে না।”

ওয়াইনের বোতলের মুখ খুলে সেটা থেকে খানিকটা ওয়াইন নিজের গ্লাসে পুরলো বৃদ্ধ মেয়েটার জন্য। আর নিজের জন্য গ্লাসবোর্ড থেকে একটা সাধারণ গ্লাস টেনে নিলো।

“শুভ জন্মদিন,” বললো বৃদ্ধ। একটা দারুণ আর আনন্দময় জীবন কাটাও। কোনো কিছুই যেনো তোমার জীবনে কালো ছায়া না ফেলে।”

গ্লাসে টোকাটুকির পালা শেষ হলো।

মনে মনে অবশ্য বৃদ্ধের বলা শেষ কথাটা আউড়ালো মেয়েটাঃ কোনো কিছুই যেনো তোমার জীবনে কালো ছায়া না ফেলে। জন্মদিনের শুভকামনা জানাতে এমন অদ্ভূত সব শব্দ কে বলে?

“জীবনে বিশতম জন্মদিন একবারই আসে মিস। অসাধারণ একটা দিন!”
“ঠিক বলেছেন স্যার,” বলে খুব সাবধানে গ্লাসে চুমুক দিলো মেয়েটা।
“আর তোমার এমন অসাধারণ একটা দিনে দয়ালু এক পরীর মতন আমাকে খাবার দেওয়ার কষ্ট করেছো তুমি।”
“আমি শুধু আমার কাজ করছি স্যার।”
“তাও,” বলতে বলতে মাথা ঝাঁকাল বৃদ্ধ। “তাও প্রিয় মিস, এমনটাই বা কয়জন করে?”

ডেস্কের পাশের চামড়ার চেয়ারটায় এতোক্ষণ বসেছিলো বৃদ্ধ। এবার ধীরপায়ে সোফায় বসা মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেলো। হাঁটু একজায়গায় করে স্কার্ট হাতের মুঠিতে শক্ত করে ধরলো মেয়েটা। গলা ঝাড়ালো সে আবার। জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টি ফোঁটা গড়াচ্ছে।এই ঘরটা কেমন অদ্ভূতরকম নিঃশব্দ।

“আজ তোমার জন্মদিন আর আজ তুমি আমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছো মিস,” এমনভাবে বললো বৃদ্ধ যেনো মেয়েটাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। ডেস্কের উপরে শব্দ করে নিজের গ্লাসটা রাখলো লোকটা। “ব্যাপারটা তো সাধারণ কিছু না। অসাধারণ আর বিশেষ কিছু একটা তো বলাই যায়, তাই না?”

কী বলবে বুঝে না পেয়ে মাথা নাড়ালো মেয়েটা।

“আর তাই আমি মনে করি, ” নিজের ঝরা পাতা রঙের নেকটাই ধরে বললো বৃদ্ধ। “তোমাকে একটা উপহার দেওয়া উচিৎ। বিশেষ জন্মদিনের জন্য বিশেষ উপহার।”

লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নাড়ালো মেয়েটা, “না স্যার। দয়া করে এই নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। আমি শুধু নিজের ডিউটি অনুযায়ী আপনার জন্য খাবার এনে দিয়েছি।”

দুই হাত উপরে তুলে মেয়েটার দিকে ধরলো। “না মিস, তুমি বরং এটা নিয়ে ভাবা বন্ধ করো। আমি তোমাকে ধরাছোয়া যায় এমন কোনো উপহার দিবো না। এর তুমি দাম হিসেব করতে পারবে না। সহজ করে বলতে গেলে…” নিজের হাত ডেস্কের উপর রেখে লম্বা আর ধীর একটা নিঃশ্বাস নিলো লোকটা। “তোমার মতন দারুণ একটা পরীর জন্য একটা ইচ্ছে পূরণের সুযোগ উপহার দিতে পারি আমি। যা ইচ্ছে করে তোমার, যেটা জীবনে চাও- তেমন একটা ইচ্ছে।”

“একটা ইচ্ছে?” গলা শুকিয়ে গেলো মেয়েটার বৃদ্ধের কথা শুনে।
“তুমি যেটা চাও মিস সেটাই হবে। তবে কেবল একটাই ইচ্ছে। তোমার জন্মদিনের উপহার হিসেবে তোমার একটা ইচ্ছেই পূরণ করার উপহার দিতে পারবো আমি। কিন্তু খুব ভেবেচিন্তে বলো। ইচ্ছেটা ভুলভাল করচ করো না যেনো। একটাই ইচ্ছে।” বলে একটা আঙুল তুলে ধরলো বৃদ্ধ। “তুমি পরে মন বদলালেও ইচ্ছে কিন্তু আর ফেরত নেওয়া যাবে না।”

ভাষা হারিয়ে ফেললো মেয়েটা। একটা ইচ্ছে? জানালার শার্সিতে বাতাস আর বৃষ্টির ফোঁটা এসে ধাক্কা মেরে গেলো। ওকে কথাগুলো হজম করার সময় দিলো বৃদ্ধ। যতক্ষণ চুপ থাকলো মেয়েটা কথা বললো না বৃদ্ধও। সোজা তাকিয়ে থাকলো সে মেয়েটার চোখের দিকে। হুট করে ঘড়ির কাঁটার শব্দটা বড্ড বেশি মনে হলো।

“আমি কিছু একটা চাইবো, আর সেটা পূরণ হয়ে যাবে?”

কোনো উত্তর না ডেস্কে হেলান দিয়ে হাসলো বৃদ্ধ। মনে হলো যেনো এটাই স্বাভাবিক।

“তোমার কি কোনো ইচ্ছে আছে মিস, নাকি নেই?” নরম সুরে জানতে চাইলো সে।
“এমনটা আসলেই হয়েছিলো। বিশ্বাস করো আমি বানিয়ে বলছি না।” আমার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে কথাগুলো বললো মেয়েটা।
“আমি মতেই সেরকম ভাবছি না।” বললাম আমি। আসলেও বানিয়ে বানিয়ে এমন গল্প ফাঁদার মেয়ে ও না। “তা…চেয়েছিলে কিছু?”

আমার দিকে খানিকক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললো মেয়েটা। “আমাকে ভুল বুঝো না।” বললো সে। “আমি আসলে বৃদ্ধের কথাই পুরোপুরি বিশ্বাস করিনি তখনো। মানে আসলেও বলো, বিশ বছর বয়স কি কম? এই সময়ে রুপকথার এসব ইচ্ছেপূরণের গল্প আদৌ কি বিশ্বাস হয়? অবশ্য কিছু না চেয়েও উপায় ছিলো না। যদি ধরেও নিই যে লোকটা মজা করছিলো আমার সাথে, আমারও তার তালে তাল মেলাতে হচ্ছিলো।

চোখভর্তি জেল্লা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো বৃদ্ধ। তাই ভাবলাম যা বলছে করি। হাজার হোক আমার বিশতম জন্মদিন। দিনটা যে আর দশটা দিনের মতন যাবে না আগেই জানতাম। বিশ্বাস করি কী না করি, সেটার প্রশনই আসছিলো না তখন আসলে।”

মাথা নেড়ে সাথে সাথে মেয়েটার কথা মেনে নিলাম আমি।

“কেমন লাগছিলো আমার তখন আমার বিশ্বাস তুমি বুঝতে পারছো কিছুটা হলেও। আমার বিশতম জন্মদিনের কোথাও কোনো বিশেষ কিছু ছিলো না। কেউ আমাকে শুভ জন্মদিন বলেনি, সারাদিন মানুষের টেবিলে অ্যানচোভি সস উইথ টর্টেলিনি নিয়ে ঘুরছিলাম।”
“চিন্তা কোরো না। আসলেও বুঝতে পারছি আমি।” মাথা নাড়লাম আবার।
“তো ইচ্ছেটা বলেই ফেললাম।”

লোকটা মেয়েটার দিকে তাকিয়েই থাকলো কিছু একটা শোনার অপেক্ষায়। তার দুটো হাতই ডেস্কের উপর রাখা। ডেস্কভর্তি বিশাল সব ফাইল, অ্যাকাউন্ট বুক হবে। সাথে অবশ্য সেখানে লেখার জিনিসপাতি, একটা ক্যালেন্ডার আর সবুজ শেডওয়ালা ল্যাম্পও ছিলো। সেগুলোর মধ্যে বৃদ্ধের হাত দুটোকে দেখাচ্ছিলো টেবিলেরই কোনো শোপিসের মতন।

জানালার কাচে তখনও বৃষ্টি এসে বাড়ি খাচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটার ভেতর দিয়ে টোকিও টাওয়ারের আলোগুলো লাফাচ্ছে।

বৃদ্ধের কপালের ভাঁজ খানিকটা বাড়লো। “এটাই তাহলে তোমার ইচ্ছে?”

“হ্যাঁ। এটাই আমার ইচ্ছে।” বললো মেয়েটা।
“তোমার বয়েসী একটা মেয়ের জন্য ইচ্ছেটা একটু অদ্ভূত। ভেবেছিলাম অন্যকিছু চাইবে।” মন্তব্য করলো বৃদ্ধ।
“ইচ্ছেটা আপনার ভালো না লাগলে অন্যকিছু চাইতে পারি,” গলা পরিষ্কার করে বললো মেয়েটা। “আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি আসলেই অন্যকিছু চাইতে পারবো আপনি বললে।”
“না না,” নিজের হাতদুটো উঠিয়ে বাতাসে পতাকার মতন নাড়ালো লোকটা। “ইচ্ছেটার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। স্রেফ একটু অবাক হলাম আরকি মিস। অন্য কোনো স্বাভাবিক ইচ্ছে নেই তোমার? এই যেমন আরো সুন্দর হতে চাও, বুদ্ধিমান হতে চাও, বা টাকা-পয়সার মালিক হতে চাও? অন্য আর দশটা মেয়ে যা যা চাইতে পারে সেরকম কিছুই চাওয়ার ইচ্ছে নেই তোমার?”

মেয়েটা কিছুক্ষণ কোনো কথা বললো না। মনে মনে শব্দ খুঁজছে উত্তর দেওয়ার জন্যে। বৃদ্ধও কোনো তারাহুড়ো করলো না। চুপচাপ ডেস্কে হাত রেখে অপেক্ষা করতে লাগলো।

“আমিও আরো সুন্দর, বুদ্ধিমান বা ধনী হতে চাই। কিন্তু সেই ইচ্ছেগুলো সত্যি হয়ে গেলে তখন ঠিক কী হবে জানা নেই আমার। কে জানে হয়তো আমি ইচ্ছে পূরণ হয়ে গেলে নিজেকে সামলাতে পারবো না। বিশ্বাস করুন, এখনো জীবন নিয়ে ভালোভাবে বুঝি না আমি। জানি না ঠিক কীভাবে কাজ করে জীবন।”
“বুঝলাম,” হাতের আঙ্গুলগুলো মুচড়ে নিলো বৃদ্ধ। “বুঝলাম।”
“তো, আমি এই ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারি?”
“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আমার জন্য এক চুটকির ব্যাপার।”

লোকটা হুট করে বাতাসের দিকে চোখ স্থির করলো। কপালের ভাজগুলো আরো গভীর হয়ে গেলো তার। কে জানে, হয়তো তার মস্তিষ্কে পরা চিন্তার ভাঁজ ওগুলো। কোন একটা অদৃশ্য কিছুকে দেখার চেষ্টা করছিলো যেনো লোকটা। হাওয়ায় ভাসতে থাকা কোনো কিছু। হাত দুটোকে দুইদিকে প্রসারিত করে চেয়ার থেকে খানিকটা উঠে সশব্দে হাতের তালু দুটোকে একসাথে করলো বৃদ্ধ। তারপর চেয়ারে আবার বসে পড়ে খুব ধীরে আঙুলের ডগা দিয়ে ভ্রুয়ের ভাঁজগুলো যেনো সোজা করার চেষ্টা করলো। সেটা শেষ হতেই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো।

“কাজ শেষ। তোমার ইচ্ছে পূরণ হয়ে গেছে।” বললো বৃদ্ধ।
“এতো জলদি?”
“হ্যাঁ, বললাম না এক চুটকির কাজ। তোমার ইচ্ছে পূরণ হয়ে গেছে। এখন তুমি কাজে ফিরতে পারো। আমি খাওয়া শেষে কার্ট হলে রেখে দেবো।”

মাথা নেড়ে রেস্তোরাঁয় চলে গেলো মেয়েটা। খালি হাতে নিজেকে প্রচন্ড হালকা মনে হলো তার। আগেও সে এভাবে হেটেছে। তবে এখন মনে হলো কোনো অদ্ভূত আর রহস্যময় তুলোর উপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তার পা দুটো।

“ঠিক আছো? তোমার চেহারা দেখে ঠিক লাগছে না,” এক তরুণ ওয়েটার জিজ্ঞেস করলো।
নিরুত্তাপ একটা হাসি হেসে মাথা নাড়লো মেয়েটা। “তাই? না না, আমি ঠিক আছি।”
“তো, মালিকের সাথে দেখা হলো? কেমন উনি?”
“ঠিক জানি না। ভালো করে তাকাইনি আসলে।” কথা সংক্ষিপ্ত করলো মেয়েটা।

ঘন্টাখানিক বাদে হলে গিয়ে কার্ট আর জিনিসপাতি বাইরেই পেলো সে। ঢাকনা উঠিয়ে দেখলো খাবার সব শেষ। এমনকি ওয়াইন আর কফির পটটাও খালি। ৬০৪ নম্বর কামরার দরজটা নিশ্চল আর বন্ধ হয়ে পড়ে আছে হলে। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকালো মেয়েটা, মনে হলো এই বুঝি দরজাটা খুলে যাবে আবার। না, খুললো না। কার্ট নিয়ে সোজা নীচে ডিশওয়াশারের কাছে চলে এলো সে। বরাবরের মতন খালি থালা দেখে মাথা নাড়লো শেফ।

“আর কখনো ওনার সাথে দেখা হয়নি আমার।” বললো মেয়েটা। “পরে জানা গিয়েছিলো ম্যানেজারের তেমন কিছুই হয়নি। স্রেফ মামুলি পেটব্যথা। উনি ফিরে এসে পরদিন থেকেই আবার খাবার দিতে শুরু করেন। তাই ওদিকে যাওয়া হয়নি আমার আর। নতুন বছরে চাকরিটা ছাড়ি আমি। আর কখনো যাইওনি সেখানে। কেমন যেনো একটা ভয় কাজ করতো জায়গাটাকে ঘিরে। ভয় ন বলে আশঙ্কা বলা ভালো। তবে কিসের আশংসা সেটা জানা ছিলো না।”

একটা কাগজের কোস্টার হাতে নারাতে শুরু করলো মেয়েটা, “মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার বিশতম জন্মদিনে কিছুই হয়নি। সবটাই আমি ভুলভাল ভেবেছি। কোনো একটাভাবে হয়তো মাথায় ভ্রম কাজ করেছে। কিন্তু সত্যি বলছি, এখনো ভাবলে ঐ ৬০৪ নম্বর কামরার প্রত্যেকটা আসবাব, সবগুলো খুঁটিনাটি পরিষ্কার ভাসে মাথায়। সেদিন সত্যিই ঐ ঘটনা ঘটেছিলো, আর ঘটনাটা কোনো একটাভাবে আমার জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।”

পরের কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে আমরা দুইজন পানীয়তে চুমুক দিতে দিতে নিজেদের চিন্তাগুলো নিয়ে ভাবতে লাগলাম।

“একটা প্রশ্ন করবো? জিজ্ঞেস করলাম। “আরো ভালোভাবে বলতে গেলে দুটো প্রশ।”
“নিশ্চয়ই। নিশ্চয় জিজ্ঞেস কী চেয়েছিলাম সেটা জানতে চাইবেন। সবচেয়ে প্রথম এটাই জানতে চাইবেন।”
“কিন্তু মনে তো হচ্ছে তুমি ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে চাও না।”
“তাই মনে হচ্ছে?”

হ্যাঁ-বোধক ভঙ্গীতে মাথা ঝাঁকালাম।

কোস্টারটা হাত থেকে নামিয়ে চোখ সরু করে দূরের কী যেনো দেখার চেষ্টা করলো মেয়েটা।

“নিজের ইচ্ছের কথা কাউকে বলতে হয় না, জানেন তো?”
“না বলতে চাইলে জোর করবো না।” সাথে সাথে জানিয়ে দিলাম। “তবে আসলেও ইচ্ছেটা পূরণ হয়েছিলো কিনা সেটা জানতে চাই। আর যেই ইচ্ছেই করো না কেনো, সেটা নিয়ে পরে গিয়ে পস্তাতে হয়েছে কিনা সেটাও জানার সগ্রহ ছিলো। অন্য কিছু চাওনি বলে পরে গিয়ে মন খারাপ হয়েছিলো কখনো?”
“প্রথম প্রশ্নের উত্তর একইসাথে হ্যাঁ, এবং না। কে জানে, হয়তো আরো অনেকদিন বাঁচবো উত্তরটা ভালোভাবে জানার জন্য। শেষমেশ আসলেই কী হবে পুরোপুরি তো জানা নেই।”
“তারমানে যে ইচ্ছেটা করেছিলে সেটা সত্যি হতে সময় লাগে।”
“সময়ের একটা বড় ভূমিকা আমার ইছে পূরনে আছে বটে।”
“কিছু কিছু জিনিস রান্না করতে যে অনেক সময় লাগে ওরকম?”

মাথা ঝাঁকাল মেয়েটা।

কিছুক্ষণ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে খেয়াল করলাম মাথায় ওভেনে হাল্কা আঁচে বেক হতে থাকা বিশাল একটা পাইয়ের ছবি ছাড়া কিছুই আসছে না।

“আর আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর?”
“কী ছিলো যেনো প্রশ্নটা?”
“জিজ্ঞেস করেছিলাম নিজের ইচ্ছেটা নিয়ে পরে কখনো পস্তেছো কিনা।”

কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর প্রচন্ড গভীর এক চোখে তাকালো মেয়েটা। সেই গভীরতার সামনে নিজেকে বড্ড তুচ্ছ মনে হলো। মেয়েটার ঠোঁটের কোনায় কেমন যেনো একটা হাসির ছায়া ফুটে উঠলো, দেখে নিজের ভেতরের প্রশ্নটা আপনাআপনিই থমকে গেলো।

“আমি এখন বিবাহিত,” বললো মেয়েটা। “একজন সিপিএ (সার্টিফাইড পাবলিক অ্যাকাউন্টেন্ট)এর সাথে। দুটো সন্তান আছে, একটা ছেলে, আরেকটা মেয়ে। আইরিশ সেটার জাতের একটা কুকুরও আছে ঘরে। সপ্তাহে দুইবার বন্ধুদের সাথে টেনিস খেলি, অডি চালাই। আপাতত এমন একটা জীবন কাটাচ্ছি আমি।”

“শুনতে ত দারুণ লাগলো।”
“অডির বাম্পারে দুটো ডেন্ট আছে জেনেও ভালো লাগবে?”
“বাম্পারে ডেন্ট তো থাকবেই।”
“ভালো বলেছেন তো। এই লাইন লিখে বাম্পারে স্টিকার লাগানো যাবে- “বাম্পারে ডেন্ট তো থাকবেই।”

মেয়েটার মুখের দিকে ভালোভাবে তাকালাম।

“আসলে বলতে চাচ্ছিলাম যে,” নিজের সুন্দর কানের লতিটায় আঙুল বোলাতে বোলাতে বললো মেয়েটা, “যেটাই চান না কেনো, যতদূরই যান না কেনো, শেষ পর্যন্ত আপনি কিন্তু আপনিই থাকবেন। এইটুকুই।”
“বাম্পারের স্টিকারে কিন্তু এই কথাটাও সুন্দর মানাবে। যত দূরেই যান না কেনো, আপনি শেষ পর্যন্ত আপনিই থাকবেন।”

খলখলিয়ে হেসে উঠলো মেয়েটা। চেহারার ছায়াটা অবশেষে সরলো।

বারের উপর কনুইটা রেখে আমার দিকে তাকালো মেয়েটা। “আপনি বলুন। আমার জায়গায় হলে আপনি কী চাইতেন সেদিন?”

“মানে আমার বিশতম জন্মদিনের দিন?”
“হু।”

কিছুক্ষণ চিন্তা করেও কোনো ইচ্ছের কথা মাথায় এলো না।

“কিচ্ছু মাথায় আসছে না।” অবশেষে হার মেনে নিলাম। “বিশতম জন্মদিন পার করেছি- সে কী আজকের কথা?”
“আসলেই কিছু মাথায় আসছে না?”

হ্যাঁ-বোধক ভঙ্গীতে মাথা ঝাঁকালাম।
“কিচ্ছু না?”
“একদম কিচ্ছু না।”

সোজা আমার চোখের দিকে তাকালো মেয়েটা, “তার কারণ আপনার ইচ্ছেটা আরো আগেই পূরণ হয়ে গেছে।”


অক্ষরের Instagram পেইজ ফলো করুন এখানে