ছেলেবেলা থেকেই পাঠক হিসেবে আমি সর্বভূক। হাতের কাছে যাই পাই তাই গোগ্রাসে… কিন্তু ঈদের সাহিত্য সাময়িকীগুলোর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঠিক কেবল পাঠকের না—ঈদ সংখ্যা মানে, একটা কেমন ফেলে আসা সময়, একটা কেমন ঝিম ধরা আলসে দুপুরের ঘ্রাণ আর অদ্ভুত একরকমের অপেক্ষার অনুভব
আসলে, ছেলে বেলায় ঈদ এর মৌসুম তো ছিলো একটা লম্বা ছুটি গড়িয়ে-তাড়িয়ে আয়েশ করে পার করার সময়। আর একটা মূল কারণ, সেই ছুটির একটা বড় অংশে অলিখিতভাবে বরাদ্দ থাকত স্কুল কলেজের বাইরের বই পুস্তকের জন্য বরাদ্দ রাখা প্রায় অফুরন্ত সময়! ভাবতেই কী ইর্ষা হচ্ছে এখন! ঈদের আগে আগে তাই শুধু উৎসবের প্রস্তুতি নয়, অবধারিতভাবে বই বাছাইও করাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ড। বিশেষ করে যখন মাথায় থাকতো যে—গ্রামের বাড়িতে গেলে ঝলমলে ঈদ সংখ্যা পাওয়া দুঢ়হ হয়ে যাবে। সে আমলে মফস্বল শহর বা গ্রামের দোকানে সব সময় নতুন সংখ্যা পৌঁছাত না, আর পৌঁছালেও তা হাতে পাওয়া ছিলো ভাগ্যের ব্যাপার। সেইজন্যে ‘আনন্দধারা’, ‘ইত্তেফাকের ঈদ সংখ্যা’, কিংবা ‘বিচিত্রা’— এইসবের কোনো একটা হাতে পাওয়া মানে আনন্দে আট খানা হবার উপলক্ষ্য, বেশ একটা রত্নভান্ডার হাতের মুঠোয় চলে এসছে ধাঁচের ব্যাপার-স্যাপার!
গ্রামের বাড়ির সেই অলস দুপুরগুলোয়—চারপাশে নীরবতা, দূরে কারো ডাক, আর হাতে পাওয়া কড়কড়ে নতুন ঈদ সংখ্যা—সে এক অন্যরকম জগৎ। তাতে হুমায়ূন আহমেদের হালকা বিষণ্নতা, ইমদাদুল হক মিলনের সহজ সরল আবেগ, কিংবা মুহম্মদ জাফর ইকবালের কিশোর মন ছুঁয়ে যাওয়া কল্পনা—ইশ, কী সব দিন ছিলো তখন!
পরে বুঝেছি, এই ব্যক্তিগত টানটা আসলে অনেক বড় এক সাংস্কৃতিক ধারার অংশ। বাংলাদেশে ঈদ সংখ্যা গড়ে উঠেছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন মুসলিম মধ্যবিত্ত নিজেদের গল্প বলার, নিজেদের ভাষায় ভাব প্রকাশের একটি বড় পরিসর খুঁজছিল। নিয়মিত পত্রিকার সীমা ছাড়িয়ে, দীর্ঘ গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা—সব একসঙ্গে পড়ার এই আয়োজন ধীরে ধীরে আমাদের যাপনের অংশ হয়ে উঠে। আমরা অপেক্ষা করতে থাকি…
আশি-নব্বইয়ের দশকে এসে এই ব্যাপারটা শুধু সাহিত্যেই থেমে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে বাজার, বিনোদন আর সামাজিক পরিচয়ের অংশ। জনপ্রিয় লেখকদের নতুন লেখা, নতুনদের আত্মপ্রকাশ, আর মোটা মোটা সংখ্যার ভেতরে জমে থাকা অজস্র গল্প—সব মিলিয়ে বেশ একটা জমজমাট ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় পুরো বিষয়টা। পরবর্তী দশকগুলোয় সে আয়োজনের মাঝে জাঁকজমক আর জৌলুস এসে যুক্ত হয়..
আজ ডিজিটাল যুগে কাগজের সেই স্পর্শ কিঞ্চিৎ কমে গেছে, কিন্তু পড়বার আর অপেক্ষার অভ্যাসটা যায়নি। এখনও ঈদ এলেই মনে হয়—কোথাও না কোথাও নতুন গল্প অপেক্ষা করছে। মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু সেই একান্ত পাঠের আনন্দের অনুভবটা রয়ে গেছে। প্রতি ঈদে কোথাও না কোথাও আমি এখনো সেই ছোট্ট পাঠকটাকে খুঁজে পাই—যে নতুন বইয়ের পাতায় নিজের পৃথিবী বানিয়ে ফেলার ঘোরে আছে…