শৈশবের ঈদ যেন এক নির্মল স্বপ্নের বিস্তার। নরম আলোয় ভেজা একটি সকাল, যেখানে আনন্দের ভাষা ছিল সহজ, অথচ গভীর। ঈদের দিন ঘুম ভাঙত এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসে। চোখ খুলেই মেহেদি রাঙা হাত, ঘরজুড়ে উৎসবের সুর, আর মায়ের হাতে রান্না করা সেমাইয়ের গন্ধে ভরে উঠত চারপাশ। নতুন জামার মিহি খসখসে শব্দে মনে হতো, দিনটা যেন অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা।
এই আনন্দের ভেতরেই কোথাও একটা জায়গা জুড়ে থাকত ঈদ সংখ্যার জন্য অপেক্ষা। কখন বের হবে, কোথায় পাওয়া যাবে, কার লেখা থাকবে, এসব ছোট ছোট ভাবনাও ঈদের আনন্দকে আরও একটু গভীর করে দিত।
আব্বু আর ভাইরা যখন ঈদের নামাজ পড়ে ফিরতেন, তাঁদের মুখে লেগে থাকা শান্তির হাসিটা যেন পুরো ঘরটাকে আলোকিত করে দিত। সেই মুহূর্তেই ঈদ যেন সত্যিকারের রূপ পেত। ভালোবাসা, মায়া আর আশীর্বাদের নীরব এক মিলন ঘটত ঘরের ভেতরেই। তারপর শুরু হতো গ্রামের বাড়ির পথে যাত্রা। সেই পথ শুধু দূরত্ব পেরোনোর জন্য ছিল না, ছিল নিজের শেকড়ে ফিরে যাওয়ার এক গভীর টান।
পথের দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা সবুজ, খোলা আকাশ, আর বাতাসের নরম ছোঁয়া মনে করিয়ে দিত, প্রকৃতিও যেন এই আনন্দের অংশ। গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে দেখা, কোলাকুলির উষ্ণতা, আর সালামির ছোট ছোট আনন্দ মিলিয়ে তৈরি হতো এক অদ্ভুত পূর্ণতা। সেখানে সময় যেন একটু ধীরে চলত, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্ত ভরে থাকত অনুভূতিতে।
ঈদের ছুটির অলস দুপুরগুলোতে হাতে উঠে আসত সেই প্রতীক্ষিত ঈদ সংখ্যা। রঙিন প্রচ্ছদ খুলে ভেতরের গল্পগুলোর মধ্যে ডুবে যাওয়া, কোনটা আগে পড়ব তা নিয়ে নিজের সঙ্গে ছোট্ট এক দ্বন্দ্ব, আর কখন যে সময় কেটে যেত, টেরই পাওয়া যেত না। কিছু লেখা পড়তে পড়তে মনে হতো যেন নিজের জীবনেরই কোনো অংশ পড়ে ফেলছি। আবার কিছু গল্প অকারণে মন খারাপ করে দিত, তবু ভালো লাগত।
কিন্তু সময়ের নিজস্ব একটা গতি আছে। সে বদলায়, অনেক কিছু সরিয়ে দেয়, আবার নতুনভাবে গড়ে তোলে। এখনো ঈদ আসে, কিন্তু আগের সেই স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতিটা আর আগের মতো ফিরে আসে না। ব্যস্ততার ভিড়ে অনেক কিছু চাপা পড়ে যায়, দায়িত্বের চাপে আনন্দটাও যেন একটু ফিকে হয়ে পড়ে। গ্রামের পথ এখনো আছে, কিন্তু সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার সুযোগ আর আগের মতো থাকে না।
তবুও কিছু কিছু অভ্যাস ঠিক রয়ে যায়। এখনও ঈদ এলেই খোঁজখবর নেওয়া হয়, কোন কোন ঈদ সংখ্যা বের হয়েছে। কার লেখা আছে, কোনটা ভালো হতে পারে, এসব ভেবে আগেই একটা তালিকা করে রাখা হয়। মনে মনে ঠিক করে রাখি, কোনগুলো কিনব। তারপর সুযোগমতো সেগুলো সংগ্রহ করা হয়। এই ছোট্ট প্রস্তুতিটুকু যেন এখনো শৈশবের সেই অপেক্ষার সঙ্গেই কোথাও জড়িয়ে আছে।
তাই প্রতি ঈদের সকালে মনের ভেতর একটা দরজা নিঃশব্দে খুলে যায়। সেখানে এখনো সেই শৈশবের ঈদ রয়ে গেছে, একদম অমলিন হয়ে। আর সেই স্মৃতির ভেতরেই জায়গা করে আছে ঈদ সংখ্যার পাতাগুলো, যেখানে গল্প, অনুভূতি আর সময় মিশে এক হয়ে গেছে। বাস্তব যতই বদলাক, এই স্মৃতিগুলো একই রকম থেকে যায়- নির্মল, আপন আর নিঃশব্দে উজ্জ্বল।