ছোটবেলায় ঈদ মানেই ছিল নতুন জামা, পায়েস আর চাঁদ রাতের আলো। ডিপার্টমেন্টে চৌকস অফিসার হিসেবে সুনাম থাকার কারণে, ৬ষ্ঠ গ্রেডের আগ পর্যন্ত আব্বুর পোস্টিং হতো বিভিন্ন মৎস্য খামারে, তাই ঈদে দাদারবাড়ি অথবা নানাবাড়ি যাওয়া হতো না। তখন আমরা নাটোরের কারবালায় বরাইগ্রাম মৎস্যবীজ উৎপাদন খামারের অফিসারদের কোয়ার্টারে থাকতাম। সাল, বয়স কিছুই মনে নেই।

আমি ছিলাম ভীষণ দুরন্ত। আম্মু প্রতিদিন দুপুরে আমাদের দুই ভাইবোনকে ঘুম পাড়াতে শুইয়ে দিতেন, আর আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমের অভিনয় করতাম। আম্মু ঘুমিয়ে গেলেই আলতো পায়ে, আব্বুর অফিস রুমের পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে পড়তাম পুরো খামার চষে বেড়াতে। কোন গাছের খেঁজুর পেকেছে দেখতে গিয়ে পায়ে ইয়া বড় কাঁটা ফুঁটে যাওয়া ছিল সাধারণ ঘটনা। যতক্ষণ লুকানো যায় রাখতাম, যখন ব্যথায় বা রক্ত দেখে ধরা পড়ে যেতাম, তখন পিটুনি খেয়ে তারপর যেতে হতো হাসপাতালে।

দুপুরে খামারের স্টাফ আঙ্কেলদের ছেলেমেয়েদের সাথে গোল্লাছুট, নারিকেল গাছের ডাল কেটে ক্রিকেট ব্যাট বানিয়ে খেলা—কতবার ধরা পড়ে পিটুনি খেয়েছি। দুপুরে বের হওয়া যাবে না, পুকুর পারে হাঁটা যাবে না, খামারের বাইরে যাওয়া যাবে না—কত শাসন! খুব বিরক্ত লাগতো তখন আব্বু-আম্মুর প্রতি।

এরকমই এক দুপুরে বের হতে না পেরে লিভিং রুমে বসে ভাবছি, কী করা যায়। হঠাৎ কী মনে করে আব্বুর বুকশেলফটা খুলে বসলাম। মাছ চাষ নিয়ে শত শত বড়দের বইয়ের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছিল কয়েকটা ছোট্ট ছেলেমেয়েদের বই। বই খুলতেই চোখ আটকে গেল।

ভেতরে আব্বুর হাতে লেখা —
“সনি, শুভ জন্মদিন”
“সনি, ঈদের শুভেচ্ছা”
“সনি ও মিমুকে বইমেলায়”
“মিমু, শুভ জন্মদিন”

আমার জন্ম থেকে শুরু করে প্রতিটি বিশেষ দিনে—প্রতিটি ঈদে—আব্বু আমাদের জন্য বই কিনে রেখেছিলেন। অথচ কোনোদিন হাতে তুলে দেননি। কেন দেননি, জানি না।

হয়তো আমরা বড় হই—এই অপেক্ষা।
হয়তো তাঁর নীরব স্বভাব।
হয়তো উনি যে রাগী মানুষটাকে আমাদের সামনে ধরে রাখতেন, সেটা ভেঙে যাবে।
আমি কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি।

২০১৮ সালে মৎস্য অধিদপ্তরের সবচে সফল মহাপরিচালক হিসেবে গৌরবের সাথে তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অবসরের পর আমরা ধীরে ধীরে কাছাকাছি হই, বন্ধু হই। কিন্তু সেই প্রশ্নটা আর করা হয়নি।
কিন্তু সেদিন তিনি আমাকে বই পড়তে দেখেছিলেন। তারপর থেকে আর লুকিয়ে নয়—বই সরাসরি আমাদের হাতে তুলে দিতেন। সত্যি বলতে, সেদিনই আমার ভেতরে একজন পাঠকের জন্ম হয়েছিল। গল্পের বই, খবরের কাগজে ছোটদের জন্য লেখা, ঈদ সংখ্যার লেখা শুধু পরতাম না, ধীরে ধীর আমার ছোট্ট হাতের অনেক ছড়া প্রকাশও পায়। তখন বুঝতাম না, আব্বুর গম্ভীর মুখের আড়ালে ছিল আমাকে নিয়ে গর্ব। আব্বুর নীরব উৎসাহ না পেলে আজ আমি বুকস্টাগ্রামার বা বুক ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে যা কিছু করছি, হয়তো তার কিছুই করতাম না।

বড় হয়ে বইমেলা আমার জীবনের অংশ হয়ে যায়। নিজের জন্য, আম্মুর জন্য, আব্বুর জন্য, মিমুর জন্য—পছন্দ করে বই কেনা যেন ভালোবাসা প্রকাশের আরেক ভাষা। ২০২৫ সালের বইমেলাই ছিল শেষবার, যখন আব্বুর জন্য একটা বই কিনেছিলাম। ২০২২ থেকে ক্যানসারের সঙ্গে লড়তে লড়তে তিনি তখন খুবই দুর্বল; পড়তে পারেন না, কোন কিছুর দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারেন না, ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারেন না। কিন্তু আমি তাঁর জন্য বই এনেছি—এই আনন্দটা তাঁর চোখে দেখেছিলাম। আমার এক বছরেরও কম বয়সের মেয়েটা সেই বই ছুঁয়ে যে ‘আ, উ, বা, বু, বু, বু’ বুলি আউড়াত, দেখে আব্বুর ঠোঁটের কোণে যে মুস্কি হাসি এসেছিল, দেখে বুকটা ভরে গিয়েছিলো।

৪ মে, ২০২৫—আব্বু আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তবু প্রতিটি ঈদে, প্রতিটি বইমেলায়, প্রতিটি নতুন বই হাতে নেওয়ার মুহূর্তে তিনি আমার সঙ্গে আছেন। ঈদ সংখ্যার পাতা উল্টাতে উল্টাতে এখনো আমি খুঁজি বাবার হাতের লেখা সেই শুভেচ্ছাগুলো, খুঁজি সেই দুপুরের আবিষ্কারের রোমাঞ্চ। ঈদ সংখ্যা শুধু রঙিন প্রচ্ছদ নয়, শুধু গল্প-কবিতার সংকলন নয়; এ আমার শেকড়ের টান, আমার বাবার চুপচাপ ভালোবাসার গল্প, আর আমার ভেতরে জন্ম নেওয়া এক পাঠকের প্রথম অধ্যায়।


অক্ষরের Instagram পেইজ ফলো করুন এখানে