ছোটবেলায় আমার ঈদ শুরুই হতো ঈদের জামা-জুতা কেনার পর থেকে । এক অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল মনে—কাউকে দেখালে যদি ঈদ শেষ হয়ে যায়! তাই সব আলমারিতে তোলা থাকতো।

চাঁদ রাতে টিভিতে ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে…’ গান না শুনলে মনে হতো ঈদটাই বুঝি আসবে না। প্রতিবছর বাবা ঠিকই চাঁদ রাতে ব্যাগ ভর্তি সব বাজারের সাথে অবশ্যই ঈদ সংখ্যাটা মনে করে নিয়ে আসতেন। প্রায় চার-পাঁচ শ পৃষ্ঠার ঈদ সংখ্যা এত মোটা আর ভারী ছিল যে আমার ছোট্ট কোল প্রায় পুরোটাই ঢেকে যেত! মা তখন হাসতেন আর বলতেন, ‘বইয়ের ভারে আমার মেয়েটাই তো হারিয়ে গেছে!’ আমি অবশ্য সেসব কানে নিতাম না। আমার জগত তখন ওই কয়েক শ পৃষ্ঠার রঙিন মলটের ঈদ সংখ্যা নামক বইটাতে। কোঁকড়া চুলের দুটো বেণী দুলিয়ে, বিছানায় উপুড় হয়ে পা নাড়াতে নাড়াতে সেই বিশাল বইয়ের পাতায় পড়তাম রোমাঞ্চকর গল্প।

তবে ঈদসংখ্যাটা নিজের দখলে রাখা ওত সহজ ছিল না। ঈদসংখ্যা কে আগে পড়বে তা নিয়ে হতো কাড়াকাড়ি। বইটা দখলে রাখার মাস্টারপ্ল্যানগুলো যে-কোনো এডভেঞ্চার গল্পকেও হার মানাবে। ঈদসংখ্যাটা বাসায় আসতে না আসতেই দেখতাম ওটা আর পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ঠিকই জানতাম বড় আপু লুকিয়েছে। বাবার কাছে গিয়ে নালিশ করলে বাবার এক গম্ভীর ডাকেই ঈদসংখ্যাটা বড় আপু কাঁচুমাচু মুখে ফেরত দিতো। এই যে দখল নেওয়ার লড়াই, এই যে খুনসুটি, এটাই ছিল আসলে আমাদের উৎসবের আসল স্ক্রিপ্ট।

কখন যে বড় হয়ে গেলাম, টেরই পেলাম না। এখন ঈদ আসে। ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে ঈদসংখ্যাও পড়ে থাকে। বইয়ের পাতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলার সেই যে নির্ভেজাল নেশা, তা কোন এক ব্ল্যাকহোলে না হারালেও সেসব দিনগুলোর খুনসুটি হারিয়ে গেছে। এখন ঈদগুলো ছোটদের ঈদ দেখেই ঈদ ঈদ মনে হয়।


অক্ষরের Instagram পেইজ ফলো করুন এখানে