টি. ই. লরেন্স বা ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’—নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধূ-ধূ মরুভূমি, তপ্ত বালুরাশি, মরুর বুকে ছুটে চলা বেদুইন অশ্বারোহী আর এক রহস্যময় ব্রিটিশ মানস। অথচ এই রোমাঞ্চকর ইতিহাসের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক মহাকাব্যিক সাহিত্যকর্ম: ‘দ্য সেভেন পিলারস অব উইজডম’ (The Seven Pillars of Wisdom)। লরেন্সের বিখ্যাত যে গ্রন্থ কেবল যুদ্ধের ইতিহাসই নয়, বরং দুঃসাহসী এক সাহিত্যিকের কলমে লেখা মরুভূমির দর্শন। একজন মানুষের নিজের আত্মার সাথে যুদ্ধের এক করুণ আখ্যান।
যে আখ্যানের সূচনা অগ্নিগর্ভ সেই ভীষণ মাতাল দুটি বছর। ইতিহাসের পায়ে ভর করে পেছনে ফিরে তাকালে দেখি তা ১৯১৬ থেকে ১৯১৮ সাল। যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে। ঠিক তখনই অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ব্রিটিশ লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে আরবে পদার্পণ করেন টমাস এডওয়ার্ড লরেন্স। দূরদর্শি, বাকপটু আর কুশলী লরেন্স সেখানে কেবল একজন সামরিক কৌশলবিদই ছিলেন না; অধিকন্ত সবকিছু ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আরবদের ‘আমির।’ আমির বলতে অবশ্যই আক্ষরিক ধনাঢ্যতা উদ্দেশ্য নয়; বরং লরেন্স হয়ে উঠেছিলেন তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। অল্প—কিন্ত প্রভাব ও ধারণে তিনি যেন তাদেরই একজন হয়ে উঠেছিলেন। তাই তো মাত্র সামান্য ক’টি বছরের অবস্থানকালে সেই মরুর আরবদের আশ্চর্য উদার জীবন, সম্পর্কের দায়বদ্ধতা ও সামাজিক জীবনযাত্রার সেই উথাল দিনগুলোর কথাই তিনি এমন অপূর্ব ভঙ্গিতে লিখতে পেরেছেন তার এই গ্রন্থে। যেখানে রক্ত, বালু আর কূটনীতির মিশেলে জন্ম নিয়েছিল আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য।
এ সব কারণেই আদতে ‘দ্য সেভেন পিলারস অব উইজডম’ বইটিকে নির্দিষ্ট একটা শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলা বেশ কঠিন ও দুরূহ বটে। কেননা, এটি কি আত্মজীবনী, যুদ্ধের ডায়েরি, ভ্রমণকাহিনি না-কি এক শ্বেতাঙ্গ অনারবীর চোখে দেখা আরব ভূখণ্ডের মুখচ্ছবি?—পাঠকের কাছে এ প্রশ্নই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে সর্বদা। তদুপরি সাহিত্যিক আঙ্গিক থেকেও এই বইয়ে লরেন্সের গদ্যশৈলী এতটাই গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং আলঙ্কারিক যে, অনেক সমালোচক একে ‘গদ্য-মহাকাব্য’ বলে অভিহিত করেছেন। এর পটভূমি ও আখ্যানশৈলী এমনই অভিনব যে, তার লেখনীতে মরুভূমি কেবল এক ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং একটি চরিত্র হয়ে ধরা দিয়েছে। এবং এ সম্বন্ধে তিনি নিজেই লিখেছেন,
‘মরুভূমি হলো এমন এক বিশাল শূন্যতা, মানুষকে যা তার নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।’
তাই আরেকটু বিস্তারিতভাবে যদি আমরা এ বইয়ের শৈলী ও শৈল্পিক সৌন্দর্য তালাশ করি, তাহলে দেখি, লরেন্সের ভাষা এতে অত্যন্ত জটিল এবং ধ্রুপদী ঢঙের। বাইবেলের গাম্ভীর্য এবং শেক্সপিয়ারের নাটকীয়তাকেই যেন অপূর্ব কায়দায় গদ্যের শরীরে মিশিয়ে দিয়েছেন তিনি। খোনে প্রতিটি বাক্য বুঝি নিখুঁতভাবে খোদাই করা এক একটি পাথর। যেমন, মরুভূমির একটি রাতের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে এমন কাব্যিকতা তিনি করেছেন যে, ‘‘নিকষ রাতের আকাশে নক্ষত্রপুঞ্জরা এমন উজ্জ্বল হয়ে ফুটেছিল যে, মনে হচ্ছিল হাত বাড়ালেই তাদের ছোঁয়া যাবে। সেইসাথে শীতল মৃদুমন্দ বাতাস আমাদের তপ্ত শরীরে কোনো পবিত্র আশীর্বাদের মতো এসে বইছিল।’’
শব্দের এই প্রয়োগ ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশে দীর্ঘশ্বাসের মতো সুন্দর গদ্যই বইটিকে সাধারণ যুদ্ধের ইতিহাস থেকে আলাদা করে এক অনন্য সাহিত্যের মর্যাদায় উন্নীত করেছে। যাহোক, তা লরেন্সের এই বৃহৎ মহাকাব্যিক গ্রন্থটিকে মূলত তিনটি স্তরে বিশেষভাবে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা যায় । ক. যুদ্ধের কৌশল ও বীরত্ব । খ. আরবের প্রকৃতি ও মানুষ । গ. লরেন্সের আত্মিক দ্বান্দ্বিকতা।
যুদ্ধের কৌশল ও বীরত্ব : এ বইয়ের প্রধান একটি অংশজুড়ে রয়েছে গেরিলা যুদ্ধের রোমাঞ্চকর বর্ণনা। হেজাজ রেলওয়ে উড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে আকাবা বন্দর জয়-পুরো অভিযানে লরেন্সের সামরিক প্রতিভা প্রতিটি পাতায় পাতায় উজ্জ্বল। কিন্তু সেসব যুদ্ধের বর্ণনা তিনি বেরসিক কোনো ইতিহাসবিদের মতো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দেননি। বরং তা তিনি রচনা করেছেন একজন শিল্পীর চোখে আত্মস্থ করে। কবির মমতা দিয়ে শব্দকে রুপান্তর করেছেন কমনীয় সব যুগল বাক্যে। মোটকথা, আজ থেকে প্রায় একশো বছরের অধিক আগে ঘটে যাওয়া যুদ্ধে কামানের গোলার শব্দ বা মরুর ধূলিঝড়কে তিনি যেভাবে শব্দের জাদুতে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা পাঠককে সরাসরি ১৯১৭ সালের আরব মরুভূমিতে নিয়ে যায়।
আরবের প্রকৃতি ও মানুষ : নির্মোহ দৃষ্টিপাত থেকে যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে বলতে হবে, আরবদের কেবল মিত্র হিসেবে দেখেননি লরেন্স। তিনি বরং তাদের সংস্কৃতির প্রেমে পড়েছিলেন এবং জীবনাচার দেখে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। যার ফলে আমির ফয়সাল, আউদা আবু তায়ি’র মতো চরিত্রগুলোকে তিনি রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তার বর্ণনায় আরব বেদুইনদের আতিথেয়তা যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি উঠে এসেছে তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং মরুজীবনের কঠোর বাস্তবতা। ফুটে উঠেছে তাদের ওয়াদা ও সততার কথা, একইসাথে গল্পের আদলে এই বইয়ে বর্ণিত হয়েছে আরবদের একরোখা জেদ ও আত্মমর্যাদার নামে অসংবরণ আচরণের কথাও।
লরেন্সের আত্মিক দ্বান্দ্বিকতা : এই গ্রন্থের সবচেয়ে শক্তিশালী, গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় দিকটি হলো লরেন্সের নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ কখনো যেমন মনস্তাত্বিক, ঠিক তেমনি কখনো আবার তা বাহ্যিক বোঝাপড়ারও। এর ফলে একদিকে যেমন তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনুগত সৈনিক, অন্যদিকে আবার তিনি আরবদের স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর। যে দ্বন্দ্বে তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ এবং ফরাসিরা আরবদের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে না (সাইকস-পিকট চুক্তি)। অটোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ব্রিটিশদের দেয়া ‘স্বাধীন ভূ-খণ্ড বা আরব রাষ্ট্র’-এর যে ওয়াদা আরবরা তা কোনোদিনই পাবে না। বরং তারা নিশ্চিত প্রতারিতই হবে (রাশিয়া বিপ্লবের পর বলশেভিকরা এই গোপন চুক্তির কথা ফাঁস করলে আরবরা যা বুঝতেও পেরেছিল)। ফলে সবকিছু মিলিয়ে এই আগাম বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতির দহন লরেন্সকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে। এ কারণেই বোধকরি তার পুরো বইয়ে এক ধরনের অজানা বিষাদ আর অপরাধবোধের ছায়া লক্ষ্য করা যায়। যেখানে নিজেকে তিনি একজন ‘অভিনেতা’ হিসেবে দেখেছেন এবং চিত্রিত করেছেন—যিনি মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে একটি জাতিকে বিজয়ের পথে নিয়ে যাচ্ছেন।
সে যাহোক, যেহেতু মনুষ্য সৃষ্টি সমস্ত শিল্পকর্মেরই খুঁত থাকে। বিতর্ক ও যুক্তি যেহেতু সাহিত্যেরই অপারপর একটি অংশ। তাই স্বাভাবিকভাবেই লরেন্স আর তার এইঅমর সৃষ্টিকর্মও একদা সেই ‘ঐতিহাসিক সত্য বনাম সাহিত্যের সত্য’-এর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে অনেক ঐতিহাসিকের মতে, লরেন্স তার বইয়ে নিজের ভূমিকা নিয়ে কিছু অতিরঞ্জন দেখিয়েছেন। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমরা যেহেতু বিশ্বাস করি, সাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘ব্যক্তিগত সত্য’ বা ‘পারসেপশন’ অনেক বড় বিষয়, তাই লরেন্স যখন লেখেন, তখন তিনি কেবল তথ্য দেন না, বরং তার হৃদয়ের ক্ষতগুলোকেই উন্মুক্ত করে দেন। ফলে এটি ইতিহাসের চেয়েও বড় এক মানসিক মানচিত্র হয়ে দাঁড়ায়। তাই কেন আজও এই বই প্রাসঙ্গিক?—এই বিতর্ক কিংবা প্রয়োজনীয়তা একইসাথে যখন উথ্থাপিত হয়, তখন বলতে দ্বিধা নেই যে, আধুকি পৃথিবীতে যখন আমরা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দেখি, তখন ‘দ্য সেভেন পিলারস অব উইজডম’ পাঠের প্রয়োজনীয়তা আরও প্রকট হয়ে ওঠা অতীব জরুরী ও স্বাভাবিক। কারণ, এটি কেবল কোনো সাম্রাজ্যবাদের পতনের গল্প নয়, বরং এমন এক মানুষের আখ্যান—যিনি দুই পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছিলেন। লরেন্সের ভাষায়, তিনি চেয়েছিলেন আরবদের এক নতুন প্রভাত উপহার দিতে, কিন্তু শেষে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন একরাশ ‘ধুলো আর বিষাদ’ এর মধ্যে। এ কারণেই বইটির শেষ পাতায় এসে পাঠকের মনে হয়, জয়ী হওয়ার পরও লরেন্স আসলে পরাজিত হয়েছিলেন। তিনি পরাজিত হয়েছিলেন নিজের আদর্শের কাছে, নিজের সত্যের কাছে।
অতএব, এ কথা বলাই যায় যে, ‘দ্য সেভেন পিলারস অব উইজডম’ কেবল একটি কাগজের পুস্তকই নয়; প্রকৃতপক্ষে এটি হলো মরুভূমির উত্তাপে পোড়া এক শিল্পীল আর্তনাদ। চিরকাল যা সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে যাবে।