Eric Margolis লিখিত একটি প্রতিবেদন, Japan’s Supersized World of Books, প্রকাশিত হয়েছিলো প্রখ্যাত Unseen Japan পত্রিকায়, ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিলে। জাপানি সাহিত্যের আগ্রহী পাঠক অধ্যাপক অভিজিৎ মুখার্জি সেটি এখানে বাংলায় অনুবাদ করেছেন।


ইদানিং জাপানি বই নতুন করে বেশ প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। কিন্তু যতকিছু প্রকাশিত হয় জাপানে, তার একটা ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ কেবল ইংরিজিতে অনুবাদ হয়। কোন বইগুলো অনূদিত হয় না, কেনইবা হয় না, তা এখানে জানানো হচ্ছে।

মিয়েকো কাওয়াকামি, ইউ মিরি, ইয়োকো তাওয়াদা, এই সময়ের এরকম সব জাপানি লেখক লেখিকারা বড়ো বড়ো নানা আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। সর্বোচ্চ স্তরের নানা কাগজে, ম্যাগাজিনে, এবং সমালোচকদের থেকে দারুণ রিভিউও পেয়েছেন। সেইসঙ্গে একটু হালকা উপন্যাস বা মাংগাতে বাজার একেবারে ছেয়ে গেছে। একটা ইসেকাই () গোত্রের কল্প-উপন্যাস পেলেই প্রকাশকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যাচ্ছে, ছাপানোর লাইসেন্স নেওয়ার জন্য।

সর্বোচ্চস্তরের সাহিত্য জগতে জাপানি লেখকেরা যথেষ্ট খ্যাতি পেয়েছেন। সাধারণ পাঠকদের যে বাজার, সেখানেও তাঁরা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন, সর্বত্র বিপুল সংখ্যায় তাঁদের ভক্তরা। জাপানে সাহিত্যচর্চার যে চিত্রটা, বাইরের জগত তার ব্যাপ্তি ও গভীরতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলেই এটা ঘটছে। সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় মাথাপিছু 40% বেশি বই প্রকাশ করে জাপান। প্রকাশক সংস্থার সংখ্যাও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে জাপানে বেশি, যদিও জনসংখ্যার দিক থেকে অর্দ্ধেকের চেয়েও অনেকটা কম।

এককথায়, জাপানে প্রকাশিত বইয়ের একটা বিশাল অংশই কিন্ত অনূদিত হয় না। পাবলিশারস উইকলির যে ডেটা-বেস (তথ্য-ভাণ্ডার), তাতে দেখা যাচ্ছে, 2019 সালে ইংল্যাণ্ডে, অনূদিত জাপানি বই প্রকাশ হয়েছিলো মাত্র 24-টা (মাংগা আর হালকা উপন্যাস বাদ দিলে)। সেবছর জাপানে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কিন্তু, একেবারে মাত্রাছাড়া, 71,000-টি!

মাংগা আর লঘু ধরনের চটুল উপন্যাসকে বাদ দিলে, 2018 থেকে 2022 সাল, এই সময়টাতে বছরে গড়ে 30-টা মতো জাপানি বই ইংরিজিতে অনূদিত হয়েছে। দশবছর আগে সংখ্যাটা ছিলো 25, অর্থাৎ বছরপ্রতি আগের চেয়ে বেশি সংখ্যক জাপানি বই ইংরিজি অনুবাদে পাওয়া যাচ্ছে—তবে, সামান্যই কিছু বেশি।

পুরো জাপান জুড়ে সংবাদপত্রে বা ম্যাগাজিনে যেসব জাপানি বইয়ের উল্লেখ অথবা রিভিউ করা হয়েছে, সেগুলোকে নিয়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানি সাহিত্যের অধ্যাপক, হয়ট লঙ, একটা ডেটা-বেস তৈরি করেছেন। বিস্তৃত জাপানি সাহিত্য জগতের ব্যাপার স্যাপার অনুধাবনের জন্য, ‘মেশিন ট্র্যান্সলেশান’-এর সাহায্য নিয়ে উনি কাজগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিভুক্ত করেছেন।

“আমি পরিষ্কার দেখলাম, কতকগুলো বিশেষ শ্রেণিভুক্ত অজস্র বই রয়েছে, যেগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক, কিন্তু ইংরিজিতে অনূদিত হচ্ছে না,” লঙ বলছেন, “প্রচুর ঐতিহাসিক কাহিনী, রহস্যকাহিনী এবং থ্রিলার, আর তার সঙ্গে বেশ কিছু সদ্য বয়ঃপ্রাপ্তদের পড়ার মতো ফিকশন।”

অ্যামাজন বা বইয়ের চেইন-স্টোর কিনোকুনিইয়া, বেস্ট-সেলিং বইয়ের যে তালিকা পেশ করে, সেখানেও সেই একই ব্যাপার। কিনোকুনিইয়ার কুড়িটা সর্বোচ্চ বিক্রিত বইয়ের মধ্যে অর্দ্ধেকই হচ্ছে রহস্যকাহিনী, নতুবা ঐতিহাসিক কাহিনী।।

লঙ বলছেন, “এই কাজগুলোতে জাপানের বইয়ের বাজার সোৎসাহে সাড়া দেয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশকেরা এগুলোকে নেয় না। যে ধরনের বইগুলো জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, সেগুলো ঠিকমতো আমাদের কাছে এসে পৌঁছোচ্ছে না।”

লঙের কথা হলো, অনুবাদের জন্য বিবেচিত হতে হলে লেখকদের আগে একটা পর্যায়ের খ্যাতি হাসিল করতে হয়, কিংবা শিল্পের বিচারে একটা মানের ওপরে উঠতে হয়। “স্পষ্টতই নানা ধরণের ফিকশনের একটা বাজা্র অ্যামেরিকায় রয়েছে, কিন্তু এই কাজগুলোকে এখানে নিয়ে আসা আর হয়ে উঠছে না।”

সর্বাধিক বিক্রীত জাপানি বইগুলোর কয়েকটাকে একটু খুঁটিয়ে দেখে বর্তমান ধারাটার কিছু কিছু ব্যাপার বোঝা গেলো।

নন-ফিকশনের বেলায় বইয়ের নামগুলো হচ্ছে এরকম, ‘সীমিত সময় কীভাবে ব্যয় করবেন’; গাড়ি চালানোর ব্যাপারে: ভবিষ্যতকে পালটে দেওয়ার জন্য অতীতের এক রাজদূত; পয়সাকড়ির ব্যাপারে: কীভাবে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়; আমার মা যে শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিলো: আপনি যা হতে পারেন, হয়ে উঠুন; “জীবনচর্যা” বা “নিজেকে উন্নত করে তোলা”, এই সম্বন্ধিত বইয়ের একটা বিশাল বাজার আছে জাপানে, এমন অনেক প্রকাশনা সংস্থা আছে যারা কেবলমাত্র এগুলোতেই আগ্রহী।

বিপুল সংখ্যায় বিক্রি হওয়া এই বইগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে অল্পই কিছু ফিকশন গোত্রীয় বই। যেগুলো পারে, সেগুলো তুলনায় অনেকটাই সাহিত্যধর্মী। প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারার মতো (পেরেছিলোও) একটা উদাহরণ হলো মিজু ৎসুজিমুরার লেখা Arrogance and Goodness, ইনি জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের অন্যতম। এর আগে অনূদিত হয়েছে এঁর  2017-র বই  Lonely Castle in the Mirror, আর সাম্প্রতিকতম বইটা নিজের হারিয়ে যাওয়া দয়িতাকে খুঁজে বেড়ানো এক তরুণকে কেন্দ্র করে। দারুণ উৎসাহব্যঞ্জক রিভিউ পেয়েছে এই বইটা।

তালিকার আরেকটু নিচের দিকে নামলে কিন্তু ফিকশনগুলোতে মিলিয়ে মিশিয়ে মোটামুটি অধিকাংশই ঐতিহাসিক কাহিনী, রোম্যান্স, থ্রিলার। ব্যতিক্রম হিসেবে সুপরিচিত কয়েকজনকে বাদ রাখলে, যেমন কেইগো হিগাশিনো, যিনি সর্বকালের খ্যাতনামা রহস্যোপন্যাস লেখকদের অন্যতম, এগুলোর মধ্যে খুব অল্পই ইংরিজিতে অনূদিত হয়।

“উপন্যাস হোক, চলচিত্র হোক, বা মাংগা, পাঠক বা দর্শকরা যে সেটাকে আত্মস্থ করতে খুব বেশ সময় ব্যয় করা পছন্দ করছেন না, ইদানিংকালে জাপানের সাহিত্যসমালোচকরা সেই নিয়ে আলোচনা করেছেন।”, সাহিত্য সমালোচক ও বইয়ের রিভিউয়ার সাওরি কুরামোতো সেকথা জানালেন।

“সাম্প্রতিক কয়েক বছরে, ব্যবসা্যিক সাফল্যের উপাদান আছে এমন সব ধরনের কাজেই ‘গতি’ ব্যাপারটাকে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। বহু জনপ্রিয় চটুল উপন্যাসেই এটা দেখা যায়, এবং এগুলো সবই মূলত নতুনকরে জন্ম দেওয়া ‘ইসেকাই’ (ভিন্ন এক অপরিচিত জগত) কেন্দ্রিক কাহিনী। চরিত্রগত জটিলতা গড়ে তোলার পরিবর্তে, লেখকেরা ব্যবহার করছেন বেশ সহজবোধ্য কোনো প্রতীকাত্মক আবহ। বুঝতেই পারছি, লেখকেরা কাহিনীর প্লটটা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েই স্থির করে রাখছেন।”

ইসেকাই (ভিন্ন অপরিচিত জগত) কেন্দ্রিক চটুল উপন্যাসের অনুবাদ যেখানে বাজার ছেয়ে ফেলছে, অন্যান্য ধরনের জাপানি বই কিন্তু অবহেলিত হচ্ছে। (সূত্র: ট্যুইটার)

2022 সালে যে 28-টা জাপানি বই অনুবাদ হয়ে বেরিয়েছে, তার 19-টাই লিখেছেন মহিলারা। অনূদিত হওয়ার দিক থেকে যে লেখকেরা অগ্রগণ্য, তাঁদের অনেকেই মহিলা, যেমন, ইয়োকো ওগাওয়া, সায়াকা মুরাতা, বানানা ইয়োশিমোতো। এটা যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বেলায় বা ইংরিজি ভাষার ক্ষেত্রে ঘটছে, তা কিন্তু নয়। এর ভিত্তিতেই রয়েছে এখনকার জাপানে সাহিত্যের যে চিত্রটি বিরাজ করছে।

নমুনা হিসেবে সংবাদপত্রের সেই হেডলাইনটার কথা বলা যেতে পারে: গতবছর মর্যাদাব্যঞ্জক আকুতাগাওয়া পুরস্কারের জন্য যতজন দাবিদার বলে বিবেচিত হয়েছিলেন, তাঁদের সব্বাই ছিলেন মহিলা। 1935 সালে পুরস্কারটা প্রবর্তনের পর থেকে এবারই প্রথম দেখা গেলো যে সব ক’জন প্রার্থীই মহিলা।

কুরামোতো বলছেন, “মহিলা ঔপন্যাসিকদের সবগুলো উপন্যাসের ক্ষেত্রে খেটে যায় এমন কিছু বলতে গেলে সমস্যায় পড়তে হবে, ব্যাপারটা বাড়াবাড়িও বটে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের বইগুলোর একটা অপরিহার্য লক্ষণ হচ্ছে, ওগুলোতে সেইসব লোকেদের কথা বলা হচ্ছে, যারা সমাজে একটু অনিরাপদ পরিস্থিতিতে রয়েছে, এবং পরিপার্শ্বের জগত থেকে অবহেলাই পাচ্ছে। যেমন ধরা যাক, কেন্দ্রিয় চরিত্রটি হয়তো কাজকম্মের দিক থেকে বেশ একটু কঠিন পরিস্থিতিতেই রয়েছে, কারণ তার কোনো স্থিতিশীল, নিয়মিত সময়ের কাজ নেই, কিংবা এমন কেউ, যার হয়তো মানসিক বা শারীরিক সুস্থতার অভাব, অথচ সমাজের চোখে যেন এক ‘অশরীরী’।”

কুরামোতোর মনে হচ্ছে, জাপানের সামনের সারির সাহিত্য যেন ভাষাগত প্রকরণ ও সাহিত্যিক শৈলি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে সরে এসে, আধুনিক সমাজের নানা দিকের উন্মোচন ও প্রতিনিধিত্বের পথ বেছে নিয়েছে। ওদিকে আবার লঙ বলছেন, পুরস্কারের জন্য মনোনীত লেখকদের অধিকাংশই লিখছেন খুবই সাহিত্যধর্মী লেখা, শৈলী ও ভাষার ব্যাপারে তাঁরা খুবই মনোযোগী। ওঁর বক্তব্য, “মূল ব্যাপারটা হলো, আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাহিত্যের জগত এখন মুরাকামির প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে আরো অনেক উন্মুক্ত।”

2023 সালে এসে, জাপানের নজরকাড়া লেখকদের মধ্যে যাঁরা প্রথম সারির, তাঁদের লেখা ইংরিজি অনুবাদে পাওয়া যাচ্ছে। তার সঙ্গে আসছে যথেষ্ট পরিমাণ মাংগা এবং চটুল উপন্যাস—কিন্তু এর মাঝখানে যাকিছু, সেগুলো খুব একটা আসছে না।

ইংরিজি ভাষার প্রকাশকরা কি জাপানি নন-ফিকশন ও বাজারচলতি ফিকশনের ইংরিজি অনুবাদ করিয়ে ফাঁকটা ভরাট করার চেষ্টা করবেন? জাপানি বইয়ের একটা বিশাল জগত কিন্তু ভাষার সাগর পার হয়ে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।

লেখক : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির গবেষক


অক্ষরের Instagram পেইজ ফলো করুন এখানে